সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্ধারিত দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২২ অতিরিক্ত বিচারপতি স্থায়ী, মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রায় এক বছর এক মাসের মাথায় ২২ বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়াকে ঘিরে বিচারাঙ্গনে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের বিচারিক মূল্যায়ন ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনাঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিভাগের বিচারকের সংখ্যা সাময়িকভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতি যোগ্য ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত বিচারপতিকে ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারক নিয়োগ করেন।
২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জনকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রায় এক বছর এক মাস পর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর তাঁদের মধ্যে ২২ জনকে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।
স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ২২ বিচারপতি হলেন—বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, মো. মনসুর আলম, সৈয়দ জাহেদ মনসুর, কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা, মো. জাবিদ হোসেন, মুবিনা আসাফ, কাজী ওয়ালীউল ইসলাম, আইনুন নাহার সিদ্দিকা, মো. আবদুল মান্নান, তামান্না রহমান খালিদী, মো. শফিউল আলম মাহমুদ, মো. হামিদুর রহমান, নাসরীন আক্তার, শাথিকা হোসাইন, সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসাইন, মো. তৌফিক ইনাম, ইউসুফ আবদুল্লাহ সুমন, শেখ তাহসিন আলী, ফয়েজ আহমেদ, মো. সাগীর হোসাইন এবং সিকদার মাহমুদুর রাজী।
তবে প্রশ্নের জায়গাটি হচ্ছে—দুই বছরের সর্বোচ্চ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁদের বিচারিক কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছিল। আইনাঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের একাংশের ভাষ্য, অতিরিক্ত বিচারপতিদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে তাঁদের আদালত পরিচালনা, মামলার নিষ্পত্তি, আদেশ ও রায় লেখার সক্ষমতা, পেশাগত দক্ষতা এবং আচরণসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
বিশেষ করে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করছেন, ২২ বিচারপতির মধ্যে এমন বিচারপতিও ছিলেন, যাঁদের স্থায়ীকরণের আগে পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট বিচারপতির নাম ও রায়ের তথ্য প্রকাশ্য সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না লিখে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত।
এদিকে, ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি জারি হওয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ এবং আইনের নির্দিষ্ট শাখায় জ্ঞান ও দক্ষতার মতো বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
তবে ওই অধ্যাদেশের একটি বিধানেই বলা হয়েছে, সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদের অধীনে নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত বিচারপতিকে ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থায়ী বিচারক করার ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সাধারণ সভা আহ্বানের কিছু বিধান প্রযোজ্য হবে না। ফলে শুধু দুই বছর পূর্ণ হয়নি—এই কারণেই নিয়োগকে সংবিধানবিরোধী বলা যায় না।
এরপর ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একই সময়ে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকেও স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৮ অক্টোবর ২০২৪ তাঁকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথও নিয়েছেন। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দুই বছর অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

গাইবান্ধায় জেলা শ্রমিক দলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

নির্ধারিত দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২২ অতিরিক্ত বিচারপতি স্থায়ী, মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

Update Time : ০৮:১৩:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রায় এক বছর এক মাসের মাথায় ২২ বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়াকে ঘিরে বিচারাঙ্গনে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের বিচারিক মূল্যায়ন ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনাঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিভাগের বিচারকের সংখ্যা সাময়িকভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতি যোগ্য ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত বিচারপতিকে ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারক নিয়োগ করেন।
২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জনকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রায় এক বছর এক মাস পর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর তাঁদের মধ্যে ২২ জনকে হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।
স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ২২ বিচারপতি হলেন—বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, মো. মনসুর আলম, সৈয়দ জাহেদ মনসুর, কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা, মো. জাবিদ হোসেন, মুবিনা আসাফ, কাজী ওয়ালীউল ইসলাম, আইনুন নাহার সিদ্দিকা, মো. আবদুল মান্নান, তামান্না রহমান খালিদী, মো. শফিউল আলম মাহমুদ, মো. হামিদুর রহমান, নাসরীন আক্তার, শাথিকা হোসাইন, সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসাইন, মো. তৌফিক ইনাম, ইউসুফ আবদুল্লাহ সুমন, শেখ তাহসিন আলী, ফয়েজ আহমেদ, মো. সাগীর হোসাইন এবং সিকদার মাহমুদুর রাজী।
তবে প্রশ্নের জায়গাটি হচ্ছে—দুই বছরের সর্বোচ্চ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁদের বিচারিক কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছিল। আইনাঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের একাংশের ভাষ্য, অতিরিক্ত বিচারপতিদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে তাঁদের আদালত পরিচালনা, মামলার নিষ্পত্তি, আদেশ ও রায় লেখার সক্ষমতা, পেশাগত দক্ষতা এবং আচরণসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
বিশেষ করে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করছেন, ২২ বিচারপতির মধ্যে এমন বিচারপতিও ছিলেন, যাঁদের স্থায়ীকরণের আগে পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট বিচারপতির নাম ও রায়ের তথ্য প্রকাশ্য সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না লিখে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত।
এদিকে, ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি জারি হওয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ এবং আইনের নির্দিষ্ট শাখায় জ্ঞান ও দক্ষতার মতো বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
তবে ওই অধ্যাদেশের একটি বিধানেই বলা হয়েছে, সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদের অধীনে নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত বিচারপতিকে ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থায়ী বিচারক করার ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সাধারণ সভা আহ্বানের কিছু বিধান প্রযোজ্য হবে না। ফলে শুধু দুই বছর পূর্ণ হয়নি—এই কারণেই নিয়োগকে সংবিধানবিরোধী বলা যায় না।
এরপর ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একই সময়ে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকেও স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৮ অক্টোবর ২০২৪ তাঁকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথও নিয়েছেন। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দুই বছর অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।