রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধার ৩৮ সিনেমা হলের গৌরব এখন ইতিহাস, টিকে আছে শুধু তাজ

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গাইবান্ধার বিভিন্ন সিনেমা হলের সামনে শুরু হতো মানুষের ঢল। নতুন সিনেমা মুক্তির দিনে টিকিট কাউন্টারের সামনে ভোর থেকেই লম্বা লাইন, রিকশা-ভ্যানে মাইকিং, দেয়ালজুড়ে রঙিন পোস্টার আর চারটি শোকে ঘিরে উৎসবের আমেজ-সব মিলিয়ে সিনেমা হল ছিল জেলার মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদন কেন্দ্র। কিন্তু সময় বদলেছে। ডিজিটাল যুগের প্রবাহে একে একে নিভে গেছে গাইবান্ধার রূপালি পর্দার আলো। জেলার সাত উপজেলায় একসময় থাকা ৩৮টি সিনেমা হলের অধিকাংশই আজ ইতিহাস। কোথাও মার্কেট, কোথাও হাসপাতাল, কোথাও শোরুম কিংবা বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের মাঝেও এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গাইবান্ধা শহরের তাজ সিনেমা হলজেলার শেষ নিয়মিত চালু সিনেমা হল হিসেবে।একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের মিলনমেলা আশির ও নব্বইয়ের দশকে গাইবান্ধার মানুষের জীবনের সঙ্গে সিনেমা হল ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা বড় কোনো সিনেমা মুক্তি মানেই ছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। শহর থেকে গ্রামের মানুষ নতুন ছবি দেখতে ভিড় জমাতেন হলগুলোতে। শুধু বিনোদন নয়, সিনেমা হল ছিল বন্ধুদের আড্ডা, পরিবারের আনন্দ আর একটি প্রজন্মের স্মৃতির অংশ।প্রবীণদের ভাষায়, সেই সময় একটি জনপ্রিয় সিনেমার টিকিট পাওয়া ছিল ভাগ্যের বিষয়। হলভর্তি দর্শকের করতালি, শিস আর উচ্ছ্বাসে মুখর থাকত পুরো পরিবেশ। হারিয়ে গেছে ৩৭টি হল, টিকে আছে শুধু তাজতথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি-এই সাত উপজেলায় একসময় মোট ৩৮টি সিনেমা হল চালু ছিল। গাইবান্ধা শহরের মায়া, চৌধুরী ও তাজ সিনেমা হল ছিল জেলার সবচেয়ে পরিচিত নাম। কিন্তু গত দুই দশকে দর্শক সংকট, লোকসান এবং আধুনিকায়নের অভাবে একের পর এক হল বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ ভবন ভেঙে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এখন সেই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে নিয়মিত চালু রয়েছে কেবল তাজ সিনেমা হল। কেন এখনও টিকে আছে তাজ সিনেমা হল? স্থানীয়দের মতে, তাজ সিনেমা হল এখনও টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান, নতুন বাংলা সিনেমা মুক্তির সময় নিয়মিত প্রদর্শনী এবং জেলার একমাত্র চালু হল হওয়ায় দর্শকদের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে এটি। ঈদ কিংবা বড় বাজেটের বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে এখনও জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দর্শক তাজ সিনেমা হলে আসেন। অনেকের কাছে এটি শুধু সিনেমা দেখার জায়গা নয়, বরং শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার একটি ঠিকানা তাজও কি একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে? এই প্রশ্ন এখন গাইবান্ধার অনেক মানুষের মুখে। দেশের বিভিন্ন জেলায় শত শত একক-পর্দার সিনেমা হল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোন, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং পুরোনো হলগুলোর অনুন্নত পরিবেশ একক-পর্দার সিনেমা হলগুলোর অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলেছে। তবে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের আশা, যথাযথ সংস্কার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভালো বাংলা সিনেমা প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তাজ সিনেমা হল আরও অনেক বছর গাইবান্ধার চলচ্চিত্র ঐতিহ্য বহন করবে। এখন আবার ফেসবুকে ভাইরাল স্মৃতি, বাস্তবে হারিয়ে যাওয়া দুই যুগ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশি ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি, পোস্টার ও সংলাপ ব্যাপকভাবে ভাইরাল হচ্ছে। সেই ছবিগুলো দেখেই অনেকের মনে ফিরে আসছে গাইবান্ধার সিনেমা হলের সোনালি দিনের স্মৃতি ডিজিটাল যুগে বিনোদন এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু একসঙ্গে শত শত মানুষের সঙ্গে বসে রূপালি পর্দায় সিনেমা দেখার যে আবেগ, তা কোনো মোবাইল ফোন বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম পূরণ করতে পারেনি। আজ গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হল শুধু একটি সিনেমা হল নয়; এটি একটি জেলার চলচ্চিত্র ইতিহাস, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা রূপালি পর্দার শেষ জ্বলন্ত প্রদীপ। এখন দেখার বিষয়-এই শেষ আলো কতদিন জ্বলতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

গাইবান্ধার ৩৮ সিনেমা হলের গৌরব এখন ইতিহাস, টিকে আছে শুধু তাজ

গাইবান্ধার ৩৮ সিনেমা হলের গৌরব এখন ইতিহাস, টিকে আছে শুধু তাজ

Update Time : ০৭:৫৭:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গাইবান্ধার বিভিন্ন সিনেমা হলের সামনে শুরু হতো মানুষের ঢল। নতুন সিনেমা মুক্তির দিনে টিকিট কাউন্টারের সামনে ভোর থেকেই লম্বা লাইন, রিকশা-ভ্যানে মাইকিং, দেয়ালজুড়ে রঙিন পোস্টার আর চারটি শোকে ঘিরে উৎসবের আমেজ-সব মিলিয়ে সিনেমা হল ছিল জেলার মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদন কেন্দ্র। কিন্তু সময় বদলেছে। ডিজিটাল যুগের প্রবাহে একে একে নিভে গেছে গাইবান্ধার রূপালি পর্দার আলো। জেলার সাত উপজেলায় একসময় থাকা ৩৮টি সিনেমা হলের অধিকাংশই আজ ইতিহাস। কোথাও মার্কেট, কোথাও হাসপাতাল, কোথাও শোরুম কিংবা বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের মাঝেও এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গাইবান্ধা শহরের তাজ সিনেমা হলজেলার শেষ নিয়মিত চালু সিনেমা হল হিসেবে।একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের মিলনমেলা আশির ও নব্বইয়ের দশকে গাইবান্ধার মানুষের জীবনের সঙ্গে সিনেমা হল ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা বড় কোনো সিনেমা মুক্তি মানেই ছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। শহর থেকে গ্রামের মানুষ নতুন ছবি দেখতে ভিড় জমাতেন হলগুলোতে। শুধু বিনোদন নয়, সিনেমা হল ছিল বন্ধুদের আড্ডা, পরিবারের আনন্দ আর একটি প্রজন্মের স্মৃতির অংশ।প্রবীণদের ভাষায়, সেই সময় একটি জনপ্রিয় সিনেমার টিকিট পাওয়া ছিল ভাগ্যের বিষয়। হলভর্তি দর্শকের করতালি, শিস আর উচ্ছ্বাসে মুখর থাকত পুরো পরিবেশ। হারিয়ে গেছে ৩৭টি হল, টিকে আছে শুধু তাজতথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি-এই সাত উপজেলায় একসময় মোট ৩৮টি সিনেমা হল চালু ছিল। গাইবান্ধা শহরের মায়া, চৌধুরী ও তাজ সিনেমা হল ছিল জেলার সবচেয়ে পরিচিত নাম। কিন্তু গত দুই দশকে দর্শক সংকট, লোকসান এবং আধুনিকায়নের অভাবে একের পর এক হল বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ ভবন ভেঙে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এখন সেই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে নিয়মিত চালু রয়েছে কেবল তাজ সিনেমা হল। কেন এখনও টিকে আছে তাজ সিনেমা হল? স্থানীয়দের মতে, তাজ সিনেমা হল এখনও টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান, নতুন বাংলা সিনেমা মুক্তির সময় নিয়মিত প্রদর্শনী এবং জেলার একমাত্র চালু হল হওয়ায় দর্শকদের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে এটি। ঈদ কিংবা বড় বাজেটের বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে এখনও জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দর্শক তাজ সিনেমা হলে আসেন। অনেকের কাছে এটি শুধু সিনেমা দেখার জায়গা নয়, বরং শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার একটি ঠিকানা তাজও কি একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে? এই প্রশ্ন এখন গাইবান্ধার অনেক মানুষের মুখে। দেশের বিভিন্ন জেলায় শত শত একক-পর্দার সিনেমা হল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোন, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং পুরোনো হলগুলোর অনুন্নত পরিবেশ একক-পর্দার সিনেমা হলগুলোর অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলেছে। তবে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের আশা, যথাযথ সংস্কার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভালো বাংলা সিনেমা প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তাজ সিনেমা হল আরও অনেক বছর গাইবান্ধার চলচ্চিত্র ঐতিহ্য বহন করবে। এখন আবার ফেসবুকে ভাইরাল স্মৃতি, বাস্তবে হারিয়ে যাওয়া দুই যুগ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশি ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি, পোস্টার ও সংলাপ ব্যাপকভাবে ভাইরাল হচ্ছে। সেই ছবিগুলো দেখেই অনেকের মনে ফিরে আসছে গাইবান্ধার সিনেমা হলের সোনালি দিনের স্মৃতি ডিজিটাল যুগে বিনোদন এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু একসঙ্গে শত শত মানুষের সঙ্গে বসে রূপালি পর্দায় সিনেমা দেখার যে আবেগ, তা কোনো মোবাইল ফোন বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম পূরণ করতে পারেনি। আজ গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হল শুধু একটি সিনেমা হল নয়; এটি একটি জেলার চলচ্চিত্র ইতিহাস, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা রূপালি পর্দার শেষ জ্বলন্ত প্রদীপ। এখন দেখার বিষয়-এই শেষ আলো কতদিন জ্বলতে পারে।