সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেলাই মেশিনে স্বপ্ন বুনবেন নান্দাইলের ২০ নারী

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় এবং বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে ২০ জন অসচ্ছল ও পিছিয়ে পড়া নারীর হাতে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে জীবিকা নির্বাহের উপকরণ হিসেবে তাঁদের হাতে এসব সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে নান্দাইল উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রধান ইমদাদুল হক মিলন।
সেলাই মেশিন পেয়ে আবেগাপ্লুত নেছাইবা বলেন, তাঁর বাবা স্কুল-কলেজের সামনে আমড়া, তেঁতুলসহ বিভিন্ন ধরনের আচার বিক্রি করে সংসার চালান। সীমিত আয়ে মা ও তিন ভাই-বোনসহ পরিবারের খরচ চালাতে বাবাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। এখন নিজের হাতে সেলাইয়ের কাজ করে আয় করে বাবার পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
নান্দাইলের একটি মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নেছাইবা বলেন, তাঁর কাছে সেলাই মেশিনটি শুধু একটি যন্ত্র নয়; পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি নতুন সুযোগ। বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে এই সহায়তা পাওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নেছাইবার মতো বুশরার জীবনেও সেলাই মেশিনটি নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে বুশরার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে। অর্থের অভাবে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেলাইয়ের কাজ কিছুটা জানা থাকলেও নিজস্ব মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁর।
সেলাই মেশিন হাতে পেয়ে বুশরা বলেন, ‘টাকার অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেলাইয়ের কাজ জানলেও মেশিন ছাড়া কিছুই করতে পারছিলাম না। আজ শুভসংঘ আমাকে নতুন জীবন দিল। এখন নিজের পায়ে দাঁড়াব, পড়াশোনাও চালাব। দেখি আর আমাকে ঠেকায় কে।’
আয়োজকরা জানান, নেছাইবা ও বুশরার মতো আরও ১৮ জন নারী এই কর্মসূচির আওতায় সেলাই মেশিন পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, আবার কেউ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই প্রথমে তাঁদের তিন মাসের নিবিড় সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে কাটিং, ডিজাইন ও আধুনিক সেলাইয়ের বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা ঘরে বসেই পোশাক তৈরি ও সেলাই করে আয় করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন পরিবারের আর্থিক চাপ কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত, ওসি (তদন্ত) মো. মোজহিদুল ইসলাম, নান্দাইল উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান লিটন, যুগ্ম আহ্বায়ক বাবু পল্লব রায়, বিএনপি নেতা হাসনাত মাহমুদ তালহা, সাংবাদিক এনামুল হক বাবুলসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, সুধীজন, সাংবাদিক এবং বসুন্ধরা শুভসংঘের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিজানুর রহমান লিটন বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেলাই মেশিন বিতরণের মাধ্যমে বসুন্ধরা শুভসংঘ অসহায় পরিবারের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি নারীদের পরনির্ভরশীলতা কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, সাময়িক ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলে তাঁদের হাতে কাজের উপকরণ পৌঁছে দেওয়াই টেকসই উন্নয়নের কার্যকর পথ। বসুন্ধরা শুভসংঘ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিতরণ করা সেলাই মেশিনগুলো কেবল যন্ত্র নয়; এগুলো ২০টি পরিবারের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করবে এবং নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথকে আরও সহজ করবে।
প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীরা জানান, তিন মাসের প্রশিক্ষণে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের পোশাকের কাটিং, ডিজাইন ও সেলাইয়ের আধুনিক পদ্ধতি শিখেছেন। এখন তাঁরা নিজেরা পোশাক তৈরি করার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের পোশাক সেলাই করে আয় করতে পারবেন। এতে পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।
সেলাই মেশিন হাতে অনুষ্ঠানের হলরুম থেকে বের হওয়ার সময় নারীদের মুখে ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ। তাঁদের কাছে এই মেশিন যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তা ও বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে নেওয়া এই কর্মসূচি নান্দাইলের অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

গাইবান্ধায় জেলা শ্রমিক দলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

সেলাই মেশিনে স্বপ্ন বুনবেন নান্দাইলের ২০ নারী

Update Time : ১০:৩৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় এবং বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে ২০ জন অসচ্ছল ও পিছিয়ে পড়া নারীর হাতে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে জীবিকা নির্বাহের উপকরণ হিসেবে তাঁদের হাতে এসব সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে নান্দাইল উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রধান ইমদাদুল হক মিলন।
সেলাই মেশিন পেয়ে আবেগাপ্লুত নেছাইবা বলেন, তাঁর বাবা স্কুল-কলেজের সামনে আমড়া, তেঁতুলসহ বিভিন্ন ধরনের আচার বিক্রি করে সংসার চালান। সীমিত আয়ে মা ও তিন ভাই-বোনসহ পরিবারের খরচ চালাতে বাবাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। এখন নিজের হাতে সেলাইয়ের কাজ করে আয় করে বাবার পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
নান্দাইলের একটি মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নেছাইবা বলেন, তাঁর কাছে সেলাই মেশিনটি শুধু একটি যন্ত্র নয়; পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি নতুন সুযোগ। বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে এই সহায়তা পাওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নেছাইবার মতো বুশরার জীবনেও সেলাই মেশিনটি নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে বুশরার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে। অর্থের অভাবে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেলাইয়ের কাজ কিছুটা জানা থাকলেও নিজস্ব মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁর।
সেলাই মেশিন হাতে পেয়ে বুশরা বলেন, ‘টাকার অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেলাইয়ের কাজ জানলেও মেশিন ছাড়া কিছুই করতে পারছিলাম না। আজ শুভসংঘ আমাকে নতুন জীবন দিল। এখন নিজের পায়ে দাঁড়াব, পড়াশোনাও চালাব। দেখি আর আমাকে ঠেকায় কে।’
আয়োজকরা জানান, নেছাইবা ও বুশরার মতো আরও ১৮ জন নারী এই কর্মসূচির আওতায় সেলাই মেশিন পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, আবার কেউ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই প্রথমে তাঁদের তিন মাসের নিবিড় সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে কাটিং, ডিজাইন ও আধুনিক সেলাইয়ের বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা ঘরে বসেই পোশাক তৈরি ও সেলাই করে আয় করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন পরিবারের আর্থিক চাপ কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত, ওসি (তদন্ত) মো. মোজহিদুল ইসলাম, নান্দাইল উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান লিটন, যুগ্ম আহ্বায়ক বাবু পল্লব রায়, বিএনপি নেতা হাসনাত মাহমুদ তালহা, সাংবাদিক এনামুল হক বাবুলসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, সুধীজন, সাংবাদিক এবং বসুন্ধরা শুভসংঘের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিজানুর রহমান লিটন বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেলাই মেশিন বিতরণের মাধ্যমে বসুন্ধরা শুভসংঘ অসহায় পরিবারের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি নারীদের পরনির্ভরশীলতা কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, সাময়িক ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলে তাঁদের হাতে কাজের উপকরণ পৌঁছে দেওয়াই টেকসই উন্নয়নের কার্যকর পথ। বসুন্ধরা শুভসংঘ সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিতরণ করা সেলাই মেশিনগুলো কেবল যন্ত্র নয়; এগুলো ২০টি পরিবারের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করবে এবং নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথকে আরও সহজ করবে।
প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীরা জানান, তিন মাসের প্রশিক্ষণে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের পোশাকের কাটিং, ডিজাইন ও সেলাইয়ের আধুনিক পদ্ধতি শিখেছেন। এখন তাঁরা নিজেরা পোশাক তৈরি করার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের পোশাক সেলাই করে আয় করতে পারবেন। এতে পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।
সেলাই মেশিন হাতে অনুষ্ঠানের হলরুম থেকে বের হওয়ার সময় নারীদের মুখে ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ। তাঁদের কাছে এই মেশিন যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তা ও বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে নেওয়া এই কর্মসূচি নান্দাইলের অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।