বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞপ্তি-পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে সুনির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও অনেক ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। ওই সময় ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে এবং ৪৬৬ জন লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে নিয়োগ পান।
ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রার্থীদের আবেদনের জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়ার বিধান ছিল। পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার শর্ত ছিল।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০১৭ সালের পর ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় পরিবর্তন এনে ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এন্ট্রি ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এতে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিতসংখ্যক বিশেষায়িত বা লেটারাল পদে নিয়োগের সুযোগ থাকলেও ইসলামী ব্যাংকে এই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
পটিয়া থেকে ৫ হাজার ১৪৮ জন
পরিদর্শন প্রতিবেদনে নিয়োগের ভৌগোলিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন পটিয়ার বাসিন্দা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার প্রার্থীদের আবেদন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকে একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
সিভি জমা হতো বিভিন্ন বাক্সে
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণের তথ্যও পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের বাক্স রাখা হতো। বাক্সগুলোতে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘মহিলা-ক্যাশ’, ‘নারী’ ও ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন পরিচয় লেখা থাকত।
এসব বাক্সে জমা দেওয়া সিভি থেকে বাছাই করা প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এরপর সেখান থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে।
২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচেও প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংকের ২৬টি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগেও নিয়ম অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগকে তাদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন।
নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু এ নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হলে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৩০৪ জন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই আরও ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৮ জন এবং লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রার্থীদের সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
কয়েকটি পদে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই হাজারো নিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) পদে ২ হাজার ২৩২ জন, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৮২৮ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৪৬৬ জনের মধ্যে ২৬৪ জন চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী ছিলেন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে ভিন্ন প্রক্রিয়ার তথ্য
পরিদর্শনের সময় ঢাকায় কর্মরত ওই সময়ের ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সিভি জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন কোনো মৌখিক পরীক্ষাও দেননি বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।
কয়েকজন কর্মকর্তা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে রাখা বাক্সে সিভি জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে নিয়োগ ও যোগদানের ব্যবস্থা করা হয়।
উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিতেও নিয়ম না মানার অভিযোগ
শুধু সাধারণ কর্মী নিয়োগ নয়, উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, ডিএমডি পদে যেতে আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবং মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের নিয়ন্ত্রণের পর আকিজ উদ্দিন ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে। একইভাবে ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিনের মোট অভিজ্ঞতা ছিল ১৭ বছর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের তথ্য ওঠার পর ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং অংশগ্রহণকারীরা সবাই উত্তীর্ণ হন।
অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তাদের কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী কর্মীদের বাধা ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। এ অভিযোগে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরবর্তীতে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, শুধু নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—এই বিবেচনায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তার ভাষ্য, নিয়োগের সময় সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় এবং অন্যদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। তবে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিদর্শন প্রতিবেদনে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

বিজ্ঞপ্তি-পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ

Update Time : ০৬:৫৩:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে সুনির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও অনেক ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। ওই সময় ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে এবং ৪৬৬ জন লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে নিয়োগ পান।
ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রার্থীদের আবেদনের জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়ার বিধান ছিল। পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার শর্ত ছিল।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০১৭ সালের পর ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় পরিবর্তন এনে ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এন্ট্রি ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এতে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিতসংখ্যক বিশেষায়িত বা লেটারাল পদে নিয়োগের সুযোগ থাকলেও ইসলামী ব্যাংকে এই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
পটিয়া থেকে ৫ হাজার ১৪৮ জন
পরিদর্শন প্রতিবেদনে নিয়োগের ভৌগোলিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন পটিয়ার বাসিন্দা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার প্রার্থীদের আবেদন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকে একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
সিভি জমা হতো বিভিন্ন বাক্সে
নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণের তথ্যও পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের বাক্স রাখা হতো। বাক্সগুলোতে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘মহিলা-ক্যাশ’, ‘নারী’ ও ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন পরিচয় লেখা থাকত।
এসব বাক্সে জমা দেওয়া সিভি থেকে বাছাই করা প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এরপর সেখান থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে।
২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচেও প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংকের ২৬টি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগেও নিয়ম অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগকে তাদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন।
নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু এ নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হলে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৩০৪ জন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই আরও ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৮ জন এবং লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রার্থীদের সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
কয়েকটি পদে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই হাজারো নিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) পদে ২ হাজার ২৩২ জন, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৮২৮ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৪৬৬ জনের মধ্যে ২৬৪ জন চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী ছিলেন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে ভিন্ন প্রক্রিয়ার তথ্য
পরিদর্শনের সময় ঢাকায় কর্মরত ওই সময়ের ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সিভি জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন কোনো মৌখিক পরীক্ষাও দেননি বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।
কয়েকজন কর্মকর্তা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে রাখা বাক্সে সিভি জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে নিয়োগ ও যোগদানের ব্যবস্থা করা হয়।
উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিতেও নিয়ম না মানার অভিযোগ
শুধু সাধারণ কর্মী নিয়োগ নয়, উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, ডিএমডি পদে যেতে আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবং মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের নিয়ন্ত্রণের পর আকিজ উদ্দিন ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে। একইভাবে ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিনের মোট অভিজ্ঞতা ছিল ১৭ বছর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের তথ্য ওঠার পর ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং অংশগ্রহণকারীরা সবাই উত্তীর্ণ হন।
অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তাদের কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী কর্মীদের বাধা ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। এ অভিযোগে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরবর্তীতে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, শুধু নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—এই বিবেচনায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তার ভাষ্য, নিয়োগের সময় সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় এবং অন্যদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। তবে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিদর্শন প্রতিবেদনে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে