ঢাকায় আবাসন এখন শুধু মাথা গোঁজার জায়গা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ-পানি, রক্ষণাবেক্ষণ, যাতায়াত, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়। কম দামে একটি ফ্ল্যাট কিনলেই আবাসন সাশ্রয়ী হয় না। ভবনটি ব্যবহারের পর যদি বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াতের খরচ বেড়ে যায়, তাহলে সেই আবাসনের প্রকৃত ব্যয়ও বাড়ে।
এ কারণে ঢাকার আবাসন পরিকল্পনায় এখন শুধু বেশি ভবন নির্মাণ নয়, বরং নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে সবুজ ভবন বা গ্রিন বিল্ডিং।
৫ অক্টোবর বিশ্ব বসতি দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। এই প্রতিপাদ্য আবাসনকে শুধু একটি ভবন বা ফ্ল্যাটের বিষয় হিসেবে নয়, বরং নগর পরিকল্পনা, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ঢাকার আবাসনের সাশ্রয় বিচার করতে তাই শুধু ফ্ল্যাটের দাম বা মাসিক ভাড়া বিবেচনা করলে হবে না। বিদ্যুৎ, পানি, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাতায়াতের খরচও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। কর্মস্থল থেকে দূরে কম ভাড়ার বাসা নিলে প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয় সেই সাশ্রয় অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। আবার অপরিকল্পিত ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা না থাকলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, ফলে বাড়ে বিদ্যুৎ বিল।
এ কারণে ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই ‘জীবনচক্র ব্যয়’ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি ভবন নির্মাণে কত টাকা খরচ হয়েছে, সেটিই তার পূর্ণ অর্থনৈতিক চিত্র নয়। বরং পরবর্তী ১০, ২০ বা ৩০ বছরে ভবনটি পরিচালনা, বিদ্যুৎ-পানি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে কত ব্যয় হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কম প্রাথমিক ব্যয়ের ভবন সব সময় সাশ্রয়ী হয় না। বরং শুরুতেই কিছুটা পরিকল্পিত বিনিয়োগ করে ভবনের শক্তি ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের ব্যয় কমানো সম্ভব। ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের বিভিন্ন গবেষণাতেও সবুজ ভবনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে এখনও অনেকের ধারণা, গ্রিন বিল্ডিং মানেই বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়। তবে ভবনের সঠিক অভিমুখ নির্ধারণ, জানালার যথাযথ বিন্যাস, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার, ছায়া তৈরির ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের মতো অনেক পদক্ষেপ নকশা পর্যায়েই নেওয়া সম্ভব। এসব ব্যবস্থা ভবনের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমাতে পারে।
বাংলাদেশের জলবায়ু, দুর্যোগঝুঁকি, স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) তৈরি করেছে HBRI-DESH Framework। DESH-এর পূর্ণরূপ Design for Environment and Sustainable Habitats। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, দুর্যোগঝুঁকি, স্থানীয় উপকরণের প্রাপ্যতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নকশা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে DESHboard সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সবুজ ভবন মূল্যায়নের একটি কাঠামো ইতোমধ্যে রয়েছে। এখন প্রয়োজন এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা।
রাজধানীর ভবিষ্যৎ আবাসন পরিকল্পনায় রাজউকের সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সনদসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী সবুজ ভবনের জন্য সর্বোচ্চ ০.৫ অতিরিক্ত এফএআর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এফএআর বা Floor Area Ratio হলো জমির আয়তনের তুলনায় ভবনের মোট গণনাযোগ্য মেঝের আয়তনের অনুপাত।
সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রেও ড্যাপে বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। অপরিকল্পিত এলাকায় A3—অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট বাড়ি এবং A6—সাশ্রয়ী আবাসনের মিশ্র ব্যবহারে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ০.৫ অথবা ০.৭৫ অতিরিক্ত এফএআর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে জমির পরিমাণ ও সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষণের শর্তও রয়েছে।
নীতিগত এসব সুবিধা ডেভেলপার ও ভবনমালিকদের সবুজ নির্মাণে উৎসাহিত করতে পারে। তবে প্রকল্প পরিকল্পনার সময় প্রণোদনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় কমার বিষয়টিও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
সবুজ আবাসনের আলোচনা শুধু নতুন ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। ঢাকায় বিপুলসংখ্যক পুরোনো ভবন রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার বা রেট্রোফিটের মাধ্যমে এসব ভবনে বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভবনের ধরন ও প্রযোজ্য শর্ত অনুযায়ী HBRI-DESH Framework-এর পাশাপাশি EDGE কিংবা LEED-এর মতো আন্তর্জাতিক সনদায়ন পদ্ধতিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
পুরোনো ভবনকে আরও দক্ষ করে তোলা অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণের তুলনায় সম্পদ ও পরিবেশ—দুই দিক থেকেই কার্যকর হতে পারে।
গ্রিন বিল্ডিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো ভবনের পুরো জীবনচক্রে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানো। এর মাধ্যমে শক্তি ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, নির্মাণসামগ্রীর কার্যকর ব্যবহার এবং ভবনের অভ্যন্তরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে এর গুরুত্ব আরও বেশি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বাড়তি চাহিদা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, বায়ুদূষণ এবং নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো সমস্যার মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ভবন ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতি বছর রাজউকের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১০ হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মাত্র ১০ শতাংশ ভবনও যদি গ্রিন বিল্ডিং হিসেবে নির্মিত হয়, তাহলে ঢাকার সবুজ আবাসন ব্যবস্থায় তা বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রচলিত নির্মাণ পদ্ধতির তুলনায় জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যয় কিছু ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। ডেভেলপার, ভবনমালিক ও ক্রেতাদের মধ্যেও সবুজ নির্মাণ সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে দক্ষ পেশাজীবী তৈরির পাশাপাশি অতিরিক্ত এফএআর, সহজ শর্তের অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রণোদনার মাধ্যমে খাতটিকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
বড় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর নকশা, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে। তারা মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পেও সবুজ নির্মাণের বাস্তব উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
একইভাবে সরকারি আবাসন, স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন নির্মাণেও শুধু প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় নয়, পুরো জীবনচক্রের ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রকল্পে প্রাথমিক বিনিয়োগের বিপরীতে পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণে কত সাশ্রয় হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য তা কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবুজ ও সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য উপযোগী ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং সহনীয় কিস্তির ব্যবস্থা করা গেলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি প্রাথমিক বিনিয়োগের বাধা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকও নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন ভবনের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের শক্তি ও সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে সংস্কারকাজের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
টেকসই নগরপরিকল্পনায় তরুণদের চিন্তা ও সৃজনশীলতাও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কার্বন কনশাস আরবান ডিজাইন আইডিয়া কম্পিটিশনের মতো উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ও পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ, সবুজায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য জনপরিসর নিয়ে বিভিন্ন ধারণা তুলে ধরেছে। এসব উদ্যোগ দেখিয়েছে, টেকসই নগর গড়তে সব সময় ব্যয়বহুল প্রযুক্তিই একমাত্র সমাধান নয়।
স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য নকশার মাধ্যমেও সীমিত সম্পদে কার্যকর নগরপরিসর তৈরি করা সম্ভব। তাই উদ্ভাবনী এসব ধারণার ব্যয়, কারিগরি বাস্তবতা ও নির্মাণযোগ্যতা যাচাই করে বাস্তব প্রকল্পে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
Global Status Report for Buildings and Construction 2025-2026-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বে যে ভবনসমষ্টি থাকবে, তার প্রায় অর্ধেক এখনো নির্মিত হয়নি। দ্রুত নগরায়ণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি বড় সুযোগও।
কারণ আজ যে ভবনের নকশা করা হচ্ছে, সেটি আগামী ৫০ বছর বা তারও বেশি সময় মানুষের ব্যবহারে থাকতে পারে। ভবনটি কতটা বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করবে, পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলবে এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের মাসিক ব্যয় কত হবে—তার বড় অংশই নির্ধারিত হবে আজকের নকশা ও নির্মাণ সিদ্ধান্তে।
তাই ঢাকার আবাসন নীতিতে এখন থেকেই সবুজ নকশা, জীবনচক্র ব্যয়, দেশীয় মূল্যায়ন কাঠামো, প্রণোদনা, সাশ্রয়ী অর্থায়ন এবং বাস্তব উদাহরণ তৈরিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ভবনগুলোকেও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
আবাসনকে সত্যিকার অর্থে সাশ্রয়ী করতে হলে শুধু নির্মাণের সময়ের খরচ কমালেই হবে না; বসবাসের পুরো সময়ের ব্যয় কমাতে হবে। পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের অর্থনৈতিক সাশ্রয়—দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর পথগুলোর একটি হলো সবুজ নির্মাণ।
ঢাকার ভবিষ্যৎ আবাসন তাই শুধু বেশি ভবনের ভবিষ্যৎ নয়; এটি হতে হবে কম ব্যয়ের, কম কার্বনের, স্বাস্থ্যকর এবং মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা আবাসনের ভবিষ্যৎ।
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
সবুজ ভবনেই ঢাকার সাশ্রয়ী আবাসনের ভবিষ্যৎ জীবনচক্র ব্যয় কমাতে বাড়ছে পরিবেশবান্ধব নির্মাণের গুরুত্ব, ড্যাপে প্রণোদনার সুযোগ
-
বিশেষ প্রতিনিধি: - Update Time : ০৮:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- ৩৩ Time View
Tag :
Popular Post























