বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়?

বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে একটি প্রতীকী জায়গায়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায়।
সংস্কারের পর ১৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর আর্কাইভ খুলে দেওয়া হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি ও কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন প্রদর্শন করা হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবাদ। ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরদিন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে প্রতিবাদ করে। ঘটনাটি নিয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ঘটনাটি কেবল ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্ন নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের কি ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখানো হবে, নাকি তাদের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে ইতিহাসের সংগ্রহশালা থেকে বাদ দেওয়া হবে?
ইতিহাসের নথি সরিয়ে ফেললে ইতিহাস বদলে যায় না। বরং কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে বুঝতে হলে তাঁর বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হয়।
জিন্নাহকে বোঝার ক্ষেত্রে ১৯৪৮ গুরুত্বপূর্ণ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরেই মারা যান। ফলে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্ন তাঁর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভাষা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। পরবর্তীতে মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদ করেন তৎকালীন শিক্ষার্থীরা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—১৯৪৮ সালের ভাষার দাবি তখনও পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ছাত্রসমাজের দাবিও ছিল ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দাবি বিস্তৃত হয়। ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে পৌঁছায়।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও ১৯৫২ সালে হঠাৎ শুরু হয়নি। ১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তৎপরতা শুরু হয়। সভা, মিছিল, ধর্মঘট, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন।
এই ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ছবির সঙ্গে ইতিহাসও থাকতে হবে
অতএব, ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকলে শুধু তাঁর ছবি প্রদর্শন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব এবং সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রসমাজের প্রতিক্রিয়ার নথিও সেখানে থাকা প্রয়োজন।
একইভাবে সেখানে থাকা উচিত ভাষা আন্দোলনের দলিল, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক নথি।
একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার কাজ কোনো ব্যক্তিকে নায়ক বানানো বা খলনায়ক বানানো নয়। কাজ হলো—কোন ব্যক্তি কী অবস্থান নিয়েছিলেন, কেন নিয়েছিলেন, সেই অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী ছিল এবং তার পরিণতি কী হয়েছিল—তা দলিলের মাধ্যমে তুলে ধরা।
জামায়াত ও ১৯৭১-এর প্রশ্ন
একই নীতি জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত বিষয়। দলটির তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কয়েকজন নেতার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমেও আলোচিত হয়েছে।
তবে এখানে ব্যক্তি, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকা আলাদা করে দেখা জরুরি।
কোনো ব্যক্তির ছবি আর্কাইভে রাখা মানেই তাঁর সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন নয়। একইভাবে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি সরিয়ে ফেললেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা মুছে ফেলা যায় না।
গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ১৯৭১ সালের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এগুলো নথিবদ্ধ করা মানে সমর্থন করা নয়; বরং ইতিহাসকে প্রমাণসহ উপস্থাপন করা।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কও ইতিহাসের অংশ
সম্প্রতি প্রকাশিত আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর স্মৃতিকথা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জামায়াতের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাক একটি খসড়া বিবৃতিও প্রস্তুত করেছিলেন, যাতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের বিরোধিতা না করার বিষয়ে দুঃখপ্রকাশের প্রস্তাব ছিল। তবে উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি।
এই তথ্যও ইতিহাসের অংশ।
কারণ ইতিহাস শুধু একটি সংগঠনের বাইরের সমালোচনা দিয়ে তৈরি হয় না। কোনো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, আত্মসমালোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ার ঘটনাও ইতিহাসের দলিল।
বর্তমান ডাকসু ও অতীতের ইতিহাস
সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতাও এই বিতর্ককে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ২৮টি কেন্দ্রীয় পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায়। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদেও ওই প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন।
এটি বর্তমান ছাত্ররাজনীতির একটি নির্বাচনী বাস্তবতা। কিন্তু কোনো নির্বাচনী ফলাফল অতীতের ইতিহাসকে বাতিল করে না। একইভাবে অতীতের কোনো রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যের অবস্থান নির্ধারণ করাও ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি হতে পারে না।
তরুণদের কী ভাবতে হবে, কাকে সমর্থন করতে হবে কিংবা কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তা বলে দেওয়ার চেয়ে তাদের সামনে তথ্য, দলিল ও ভিন্ন উৎস তুলে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তারা জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তব্য পড়ুক। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পড়ুক। ভাষা আন্দোলনের নথি ও সে সময়ের সংবাদপত্র পড়ুক। ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রকাশিত বিবৃতি ও প্রচারপত্র দেখুক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পড়ুক। আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের বিবরণও পড়ুক।
এরপর তারা নিজেরাই প্রশ্ন তুলুক এবং নিজেদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাক।
আর্কাইভ কোনো প্রচারমঞ্চ নয়
এখানেই একটি জাদুঘর বা ঐতিহাসিক আর্কাইভের মূল দায়িত্ব।
কোনো সংগ্রহশালা কোনো পক্ষের প্রচারমঞ্চ হওয়া উচিত নয়। আবার কোনো পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলার জায়গাও হওয়া উচিত নয়।
সেখানে থাকা উচিত দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ—যাতে একজন দর্শক নিজেই একটি সময়কে বোঝার সুযোগ পান।
ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবি থাকলে তার পাশে সেই সময়ের ইতিহাসও থাকবে কি না।
জিন্নাহ থাকলে তাঁর ভাষানীতির ইতিহাস থাকবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকলে তাঁর প্রস্তাব থাকবে। ভাষা আন্দোলনের নথি থাকবে। ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনাও থাকবে।
এরপর আসবে ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার রাজনৈতিক সংকট এবং ১৯৭১ সালের মার্চের সামরিক অভিযান।
থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। থাকবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ভূমিকা। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল, তাদের ভূমিকা থাকবে; যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের অবস্থানও থাকবে।
রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের ভূমিকা নিয়ে যে নথি রয়েছে, সেগুলোও থাকবে।
কারণ ইতিহাসকে পছন্দমতো বেছে নেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস দীর্ঘ পথের ইতিহাস
বাংলাদেশের জন্ম কোনো একটি ছবি, কোনো একটি ভাষণ কিংবা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের ফল নয়।
এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের পরিণতি।
ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম—এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও থাকতে পারে। নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানের সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়েও আগ্রহী হতে পারে।
এসবের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাস অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।
রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
বরং অতীত সম্পর্কে নথিভিত্তিক ও সৎ আলোচনা ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে।
ইতিহাসের উত্তর ইতিহাসেই
ডাকসুর সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে শুধু ছবি ছেঁড়া, ছবি পদদলিত করা কিংবা একটি প্রতিক্রিয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যাবে।
এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে—আমরা কি ইতিহাসকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখব, নাকি দলিল দিয়ে বুঝব?
ছবি ছিঁড়ে ফেলা ইতিহাসের সমাধান নয়। আবার বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির ছবি রেখে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা গোপন করাও ইতিহাসচর্চা নয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হলো—ইতিহাসের পূর্ণ নথি।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বাঙালির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে, বিপক্ষে কিংবা ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন—সেসব অবস্থানেরও নথি রয়েছে।
এই সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের ইতিহাস।
কোনো ছবি সেই ইতিহাস বদলাতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও পারে না। কূটনৈতিক সম্পর্কও পারে না।
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক। প্রশ্ন উঠুক। পুরোনো নথি নতুন প্রজন্ম আবার পড়ুক। ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসুক।
কিন্তু প্রমাণিত ঘটনাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা যেন না হয়।
কারণ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কোনো দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে লেখা হয়নি।
সেই ইতিহাস লেখা হয়েছে মানুষের ভাষার অধিকারের সংগ্রামে, রাজনৈতিক আন্দোলনে, ভোটে, রক্তে, যুদ্ধে এবং আত্মত্যাগে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়?

Update Time : ০৭:৩৬:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে একটি প্রতীকী জায়গায়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায়।
সংস্কারের পর ১৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর আর্কাইভ খুলে দেওয়া হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি ও কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন প্রদর্শন করা হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবাদ। ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরদিন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে প্রতিবাদ করে। ঘটনাটি নিয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ঘটনাটি কেবল ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্ন নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের কি ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখানো হবে, নাকি তাদের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে ইতিহাসের সংগ্রহশালা থেকে বাদ দেওয়া হবে?
ইতিহাসের নথি সরিয়ে ফেললে ইতিহাস বদলে যায় না। বরং কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে বুঝতে হলে তাঁর বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হয়।
জিন্নাহকে বোঝার ক্ষেত্রে ১৯৪৮ গুরুত্বপূর্ণ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরেই মারা যান। ফলে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্ন তাঁর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভাষা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। পরবর্তীতে মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদ করেন তৎকালীন শিক্ষার্থীরা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—১৯৪৮ সালের ভাষার দাবি তখনও পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ছাত্রসমাজের দাবিও ছিল ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দাবি বিস্তৃত হয়। ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে পৌঁছায়।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও ১৯৫২ সালে হঠাৎ শুরু হয়নি। ১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তৎপরতা শুরু হয়। সভা, মিছিল, ধর্মঘট, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন।
এই ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ছবির সঙ্গে ইতিহাসও থাকতে হবে
অতএব, ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকলে শুধু তাঁর ছবি প্রদর্শন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব এবং সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রসমাজের প্রতিক্রিয়ার নথিও সেখানে থাকা প্রয়োজন।
একইভাবে সেখানে থাকা উচিত ভাষা আন্দোলনের দলিল, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক নথি।
একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার কাজ কোনো ব্যক্তিকে নায়ক বানানো বা খলনায়ক বানানো নয়। কাজ হলো—কোন ব্যক্তি কী অবস্থান নিয়েছিলেন, কেন নিয়েছিলেন, সেই অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী ছিল এবং তার পরিণতি কী হয়েছিল—তা দলিলের মাধ্যমে তুলে ধরা।
জামায়াত ও ১৯৭১-এর প্রশ্ন
একই নীতি জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত বিষয়। দলটির তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কয়েকজন নেতার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমেও আলোচিত হয়েছে।
তবে এখানে ব্যক্তি, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকা আলাদা করে দেখা জরুরি।
কোনো ব্যক্তির ছবি আর্কাইভে রাখা মানেই তাঁর সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন নয়। একইভাবে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি সরিয়ে ফেললেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা মুছে ফেলা যায় না।
গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ১৯৭১ সালের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এগুলো নথিবদ্ধ করা মানে সমর্থন করা নয়; বরং ইতিহাসকে প্রমাণসহ উপস্থাপন করা।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কও ইতিহাসের অংশ
সম্প্রতি প্রকাশিত আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর স্মৃতিকথা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জামায়াতের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাক একটি খসড়া বিবৃতিও প্রস্তুত করেছিলেন, যাতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের বিরোধিতা না করার বিষয়ে দুঃখপ্রকাশের প্রস্তাব ছিল। তবে উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি।
এই তথ্যও ইতিহাসের অংশ।
কারণ ইতিহাস শুধু একটি সংগঠনের বাইরের সমালোচনা দিয়ে তৈরি হয় না। কোনো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, আত্মসমালোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ার ঘটনাও ইতিহাসের দলিল।
বর্তমান ডাকসু ও অতীতের ইতিহাস
সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতাও এই বিতর্ককে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ২৮টি কেন্দ্রীয় পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায়। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদেও ওই প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন।
এটি বর্তমান ছাত্ররাজনীতির একটি নির্বাচনী বাস্তবতা। কিন্তু কোনো নির্বাচনী ফলাফল অতীতের ইতিহাসকে বাতিল করে না। একইভাবে অতীতের কোনো রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যের অবস্থান নির্ধারণ করাও ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি হতে পারে না।
তরুণদের কী ভাবতে হবে, কাকে সমর্থন করতে হবে কিংবা কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তা বলে দেওয়ার চেয়ে তাদের সামনে তথ্য, দলিল ও ভিন্ন উৎস তুলে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তারা জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তব্য পড়ুক। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পড়ুক। ভাষা আন্দোলনের নথি ও সে সময়ের সংবাদপত্র পড়ুক। ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রকাশিত বিবৃতি ও প্রচারপত্র দেখুক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পড়ুক। আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের বিবরণও পড়ুক।
এরপর তারা নিজেরাই প্রশ্ন তুলুক এবং নিজেদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাক।
আর্কাইভ কোনো প্রচারমঞ্চ নয়
এখানেই একটি জাদুঘর বা ঐতিহাসিক আর্কাইভের মূল দায়িত্ব।
কোনো সংগ্রহশালা কোনো পক্ষের প্রচারমঞ্চ হওয়া উচিত নয়। আবার কোনো পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলার জায়গাও হওয়া উচিত নয়।
সেখানে থাকা উচিত দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ—যাতে একজন দর্শক নিজেই একটি সময়কে বোঝার সুযোগ পান।
ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবি থাকলে তার পাশে সেই সময়ের ইতিহাসও থাকবে কি না।
জিন্নাহ থাকলে তাঁর ভাষানীতির ইতিহাস থাকবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকলে তাঁর প্রস্তাব থাকবে। ভাষা আন্দোলনের নথি থাকবে। ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনাও থাকবে।
এরপর আসবে ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার রাজনৈতিক সংকট এবং ১৯৭১ সালের মার্চের সামরিক অভিযান।
থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। থাকবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ভূমিকা। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল, তাদের ভূমিকা থাকবে; যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের অবস্থানও থাকবে।
রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের ভূমিকা নিয়ে যে নথি রয়েছে, সেগুলোও থাকবে।
কারণ ইতিহাসকে পছন্দমতো বেছে নেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস দীর্ঘ পথের ইতিহাস
বাংলাদেশের জন্ম কোনো একটি ছবি, কোনো একটি ভাষণ কিংবা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের ফল নয়।
এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের পরিণতি।
ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম—এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও থাকতে পারে। নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানের সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়েও আগ্রহী হতে পারে।
এসবের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাস অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।
রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
বরং অতীত সম্পর্কে নথিভিত্তিক ও সৎ আলোচনা ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে।
ইতিহাসের উত্তর ইতিহাসেই
ডাকসুর সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে শুধু ছবি ছেঁড়া, ছবি পদদলিত করা কিংবা একটি প্রতিক্রিয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যাবে।
এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে—আমরা কি ইতিহাসকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখব, নাকি দলিল দিয়ে বুঝব?
ছবি ছিঁড়ে ফেলা ইতিহাসের সমাধান নয়। আবার বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির ছবি রেখে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা গোপন করাও ইতিহাসচর্চা নয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হলো—ইতিহাসের পূর্ণ নথি।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বাঙালির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে, বিপক্ষে কিংবা ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন—সেসব অবস্থানেরও নথি রয়েছে।
এই সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের ইতিহাস।
কোনো ছবি সেই ইতিহাস বদলাতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও পারে না। কূটনৈতিক সম্পর্কও পারে না।
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক। প্রশ্ন উঠুক। পুরোনো নথি নতুন প্রজন্ম আবার পড়ুক। ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসুক।
কিন্তু প্রমাণিত ঘটনাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা যেন না হয়।
কারণ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কোনো দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে লেখা হয়নি।
সেই ইতিহাস লেখা হয়েছে মানুষের ভাষার অধিকারের সংগ্রামে, রাজনৈতিক আন্দোলনে, ভোটে, রক্তে, যুদ্ধে এবং আত্মত্যাগে।