বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজের ব্যবসায়িক বলয়ে

রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অবসরের পর বেসরকারি একটি ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কেউ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা এর অধীন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ সরাসরি জ্বালানি ক্রয় ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সাবেক কর্মকর্তার একটি অংশ অবসরের পর ডা. এজাজুর রহমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছেন। বিপিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিপিসি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন—এমন অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা কোনো না কোনো সময়ে এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন বা যুক্ত হয়েছেন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিতে থাকার সময় অর্জিত জ্বালানি ক্রয়, দরপত্র, সরবরাহকারী নির্বাচন, মূল্য নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অবসরের পর কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে কি না।
একই ভবনে বিপিসি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়
অনুসন্ধানে এজাজের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপিসির কার্যালয়ের ভৌগোলিক নৈকট্যের তথ্যও পাওয়া গেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় একই ভবন থেকে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের করপোরেট কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। একই ভবনে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
একই ভবনে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং বিপিসির তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকা আইনত নিষিদ্ধ—এমন সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে এ ধরনের নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি দরপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সামান্য ব্যবধানেও কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিপিসির কয়েকজন কর্মকর্তা এ ধরনের অভিযোগ করলেও এর স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
১১ সরবরাহকারীর মধ্যে ছয়টির স্থানীয় যোগাযোগ
বিপিসির সরবরাহকারী তালিকা পর্যালোচনা করলে এজাজের ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে।
বিপিসির তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ ডা. এজাজুর রহমানের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
সেভেন মার্কের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ইউনিপেক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনের প্রতিনিধিত্ব করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথক হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একই ব্যবসায়িক বলয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।
অবসরের পর ট্রান্সবাংলায় সাবেক এমডি
এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীর নাম।
বিপিসির একাধিক সূত্রের দাবি, চলতি বছরের মার্চ থেকে তিনি ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ডা. এজাজুর রহমান দেশের বাইরে থাকলে জ্বালানি ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি।
তবে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজে তাঁর নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্বের ধরন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের সঠিক তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
‘রিভলভিং ডোর’ নিয়ে প্রশ্ন
বিপিসিসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে ওঠা সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ অবসরের পর বেসরকারি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন শেষে সংশ্লিষ্ট খাতের বড় সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না।
বিপিসির কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বিগত কয়েক বছরের কিছু দরপত্রে এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অল্প ব্যবধানে কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে।
তাঁদের মতে, বিষয়টি যাচাই করতে হলে গত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিড শিট, টেকনিক্যাল ও ফিন্যানশিয়াল ইভাল্যুয়েশন রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার প্রিমিয়ামের ব্যবধান, দরপত্রের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ পর্যালোচনা করলে কোনো অস্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
বিএসপি-জাপিনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
এজাজের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়েও বিপিসির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন।
জি-টু-জি সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এর নিজস্ব রিফাইনারি, রিফাইনারিতে মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
বন্দরসংক্রান্ত নথির তথ্য উল্লেখ করে তাঁরা আরও বলেন, বিপিসির জন্য বিএসপি-জাপিনের নামে আসা কয়েকটি জ্বালানি চালানের উৎস ইন্দোনেশিয়া না হয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ছিল।
তবে কোনো চালান কোন দেশ থেকে এসেছে, সেটিই সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ-যোগ্যতা বা চুক্তির বৈধতা প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে চুক্তির শর্ত, উৎসসংক্রান্ত অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রয়োজন স্বাধীন নথিনির্ভর পর্যালোচনা
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো বিষয়টি শুধু একজন ব্যবসায়ী বা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, সরকারি অর্থের সাশ্রয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িত।
একই স্থানীয় এজেন্ট যদি একাধিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর প্রতিনিধিত্ব করে, আবার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা অবসরের পর সেই এজেন্টের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং একই ব্যবসায়িক বলয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে সরকারি কার্যাদেশ পেতে থাকে—তাহলে বিষয়টি নথিনির্ভরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তারা কখন অবসর নিয়েছেন, কখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল এবং তাঁদের নতুন কর্মস্থলের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে কী ধরনের সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছে—এই তথ্যগুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে সম্ভাব্য সম্পর্কের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পণ্য। তাই কম দামে পণ্য কেনার পাশাপাশি সরবরাহের নিরাপত্তা, সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের অবসরের পর একই ব্যবসায়িক বলয়ে যোগ দেওয়ার প্রবণতা ‘রিভলভিং ডোর’ বা সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যকার কর্মপরিবর্তন নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দরপত্র বা সরকারি কার্যাদেশের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে প্রয়োজন বিড শিট, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চুক্তি, সরবরাহের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি-পরবর্তী যোগদানের সময়কাল নিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

ছয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজের ব্যবসায়িক বলয়ে

Update Time : ০৪:২১:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অবসরের পর বেসরকারি একটি ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কেউ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা এর অধীন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ সরাসরি জ্বালানি ক্রয় ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সাবেক কর্মকর্তার একটি অংশ অবসরের পর ডা. এজাজুর রহমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছেন। বিপিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিপিসি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন—এমন অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা কোনো না কোনো সময়ে এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন বা যুক্ত হয়েছেন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিতে থাকার সময় অর্জিত জ্বালানি ক্রয়, দরপত্র, সরবরাহকারী নির্বাচন, মূল্য নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অবসরের পর কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে কি না।
একই ভবনে বিপিসি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়
অনুসন্ধানে এজাজের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপিসির কার্যালয়ের ভৌগোলিক নৈকট্যের তথ্যও পাওয়া গেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় একই ভবন থেকে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের করপোরেট কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। একই ভবনে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
একই ভবনে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং বিপিসির তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকা আইনত নিষিদ্ধ—এমন সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে এ ধরনের নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি দরপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সামান্য ব্যবধানেও কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিপিসির কয়েকজন কর্মকর্তা এ ধরনের অভিযোগ করলেও এর স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
১১ সরবরাহকারীর মধ্যে ছয়টির স্থানীয় যোগাযোগ
বিপিসির সরবরাহকারী তালিকা পর্যালোচনা করলে এজাজের ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে।
বিপিসির তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ ডা. এজাজুর রহমানের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
সেভেন মার্কের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ইউনিপেক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনের প্রতিনিধিত্ব করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথক হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একই ব্যবসায়িক বলয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।
অবসরের পর ট্রান্সবাংলায় সাবেক এমডি
এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীর নাম।
বিপিসির একাধিক সূত্রের দাবি, চলতি বছরের মার্চ থেকে তিনি ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ডা. এজাজুর রহমান দেশের বাইরে থাকলে জ্বালানি ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি।
তবে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজে তাঁর নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্বের ধরন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের সঠিক তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
‘রিভলভিং ডোর’ নিয়ে প্রশ্ন
বিপিসিসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে ওঠা সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ অবসরের পর বেসরকারি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন শেষে সংশ্লিষ্ট খাতের বড় সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না।
বিপিসির কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বিগত কয়েক বছরের কিছু দরপত্রে এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অল্প ব্যবধানে কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে।
তাঁদের মতে, বিষয়টি যাচাই করতে হলে গত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিড শিট, টেকনিক্যাল ও ফিন্যানশিয়াল ইভাল্যুয়েশন রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার প্রিমিয়ামের ব্যবধান, দরপত্রের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ পর্যালোচনা করলে কোনো অস্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
বিএসপি-জাপিনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
এজাজের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়েও বিপিসির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন।
জি-টু-জি সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এর নিজস্ব রিফাইনারি, রিফাইনারিতে মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
বন্দরসংক্রান্ত নথির তথ্য উল্লেখ করে তাঁরা আরও বলেন, বিপিসির জন্য বিএসপি-জাপিনের নামে আসা কয়েকটি জ্বালানি চালানের উৎস ইন্দোনেশিয়া না হয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ছিল।
তবে কোনো চালান কোন দেশ থেকে এসেছে, সেটিই সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ-যোগ্যতা বা চুক্তির বৈধতা প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে চুক্তির শর্ত, উৎসসংক্রান্ত অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রয়োজন স্বাধীন নথিনির্ভর পর্যালোচনা
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো বিষয়টি শুধু একজন ব্যবসায়ী বা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, সরকারি অর্থের সাশ্রয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িত।
একই স্থানীয় এজেন্ট যদি একাধিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর প্রতিনিধিত্ব করে, আবার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা অবসরের পর সেই এজেন্টের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং একই ব্যবসায়িক বলয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে সরকারি কার্যাদেশ পেতে থাকে—তাহলে বিষয়টি নথিনির্ভরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তারা কখন অবসর নিয়েছেন, কখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল এবং তাঁদের নতুন কর্মস্থলের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে কী ধরনের সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছে—এই তথ্যগুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে সম্ভাব্য সম্পর্কের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পণ্য। তাই কম দামে পণ্য কেনার পাশাপাশি সরবরাহের নিরাপত্তা, সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের অবসরের পর একই ব্যবসায়িক বলয়ে যোগ দেওয়ার প্রবণতা ‘রিভলভিং ডোর’ বা সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যকার কর্মপরিবর্তন নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দরপত্র বা সরকারি কার্যাদেশের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে প্রয়োজন বিড শিট, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চুক্তি, সরবরাহের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি-পরবর্তী যোগদানের সময়কাল নিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা।