বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএম কলেজের মেধাবী ছাত্রী ঝুমুরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ

মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতু বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেছিলেন। এরপর পরিবারের সম্মতিতে তিনি বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন। অবশেষে প্রবাসী স্বামী ও তার লোভী পরিবারের অব্যাহত মানসিক নির্যাতন অকালেই কেড়ে নিয়েছে মেধাবী ঝুমুরের প্রান। নিহত ঝুমুরের ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। এরপর মঙ্গলবার দিবাগত রাত দশটার দিকে জানাজা শেষে ঝুমুরকে তার বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এরআগে রাত নয়টার দিকে ঝুমুর খানম সেতুর লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স তার বাবার বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের আর্তনাতে আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের বাড়ি এবং তার আশেপাশের এলাকার আকাশ-বাতাস ভাড়ি হয়ে ওঠে। শোকে স্তব্দ হয়ে পরে এলাকাবাসী।

জানাজার নামাজে উপস্থিত সকলেই দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এলাকাবাসী ও নিহত ঝুমুরের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সাথে জড়িত সকলকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।

কি ঘটেছিলো মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতুর সাথে :

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে ঝুমুর। নিজের অদম্য ইচ্ছা ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরনায় বরিশাল সরকারি বজ্রমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেন ঝুমুর খানম সেতু। পরবর্তীতে সামাজিকভাবে পাশ্ববর্তী গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সাথে বিয়ে হয় ঝুমুরের।

ঝুমুরের বাবা করিম খান জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে মেয়ে জামাতা শাহারিয়া, তার মা রুনু বেগম, বোন নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানমসহ নাজমিনের জামাতা সাইদুল হাওলাদার কারণে অকারণে ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো। করিম খান আরো জানিয়েছেন-ঝুমুরের স্বামী বর্তমানে কর্মের সুবাধে কুয়েতে রয়েছেন। কিন্তু দেশে থাকা তার পরিবারের উল্লেখিত ব্যক্তিদের প্ররোচনায় ঝুমুরের ওপর মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় শাহারিয়ার। একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি থেকে ঝুমুরকে তার একমাত্র মেয়েসহ তাড়িয়ে দেয়া হয়। সেই থেকে ঝুমুর তার কন্যাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করেন।

করিম খান অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেয়া, পাঁচশ’ বরযাত্রীকে না আনাসহ ঝুমুর দেখতে সুন্দরী না হওয়ার অজুহাত তুলে, দীর্ঘদিন থেকে শাহারিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো। ঘটনারদিন (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে শাহারিয়া ভিডিও কল দিয়ে ঝুমুরকে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করে। একপর্যায়ে তাকে (ঝুমুর) বিষপান করে মরে যাওয়ার কথা বলে। স্বামীর এ মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে পরিবারের সবার অজান্ত ঝুমুর বিষপান করে।

মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ও পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা এগারোটার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঝুমুর খানম সেতুকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরন করা হয়। পরবর্তীতে ওই গৃহবধূর স্বজনরা তাৎক্ষনিক ঝুমুরকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেল পাঁচটার দিকে ঝুমুর মৃত্যুরকোলে ঢলে পরেন।

নিহত ঝুমুরের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, বিষপানের পর তিনটি হাসপাতালে ভর্তি, পরবর্তীতে মৃত্যু থেকে দাফন পর্যন্ত তার (ঝুমুর) স্বামীর পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। অপরদিকে অভিযোগের বিষয়ে নিহত ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া কাজী শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কেউ কোন কথা বলতে রাজি হয়নি।

উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস পূর্বে ঝুমুর খানম সেতুর ২০ বছরের একমাত্র ভাই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ঝুমুর খানম সেতুর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারসহ ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

বিএম কলেজের মেধাবী ছাত্রী ঝুমুরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ

Update Time : ০৭:২৪:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতু বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেছিলেন। এরপর পরিবারের সম্মতিতে তিনি বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন। অবশেষে প্রবাসী স্বামী ও তার লোভী পরিবারের অব্যাহত মানসিক নির্যাতন অকালেই কেড়ে নিয়েছে মেধাবী ঝুমুরের প্রান। নিহত ঝুমুরের ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। এরপর মঙ্গলবার দিবাগত রাত দশটার দিকে জানাজা শেষে ঝুমুরকে তার বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এরআগে রাত নয়টার দিকে ঝুমুর খানম সেতুর লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স তার বাবার বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের আর্তনাতে আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের বাড়ি এবং তার আশেপাশের এলাকার আকাশ-বাতাস ভাড়ি হয়ে ওঠে। শোকে স্তব্দ হয়ে পরে এলাকাবাসী।

জানাজার নামাজে উপস্থিত সকলেই দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এলাকাবাসী ও নিহত ঝুমুরের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সাথে জড়িত সকলকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।

কি ঘটেছিলো মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতুর সাথে :

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে ঝুমুর। নিজের অদম্য ইচ্ছা ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরনায় বরিশাল সরকারি বজ্রমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্স পাশ করেন ঝুমুর খানম সেতু। পরবর্তীতে সামাজিকভাবে পাশ্ববর্তী গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সাথে বিয়ে হয় ঝুমুরের।

ঝুমুরের বাবা করিম খান জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে মেয়ে জামাতা শাহারিয়া, তার মা রুনু বেগম, বোন নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানমসহ নাজমিনের জামাতা সাইদুল হাওলাদার কারণে অকারণে ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো। করিম খান আরো জানিয়েছেন-ঝুমুরের স্বামী বর্তমানে কর্মের সুবাধে কুয়েতে রয়েছেন। কিন্তু দেশে থাকা তার পরিবারের উল্লেখিত ব্যক্তিদের প্ররোচনায় ঝুমুরের ওপর মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় শাহারিয়ার। একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি থেকে ঝুমুরকে তার একমাত্র মেয়েসহ তাড়িয়ে দেয়া হয়। সেই থেকে ঝুমুর তার কন্যাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করেন।

করিম খান অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেয়া, পাঁচশ’ বরযাত্রীকে না আনাসহ ঝুমুর দেখতে সুন্দরী না হওয়ার অজুহাত তুলে, দীর্ঘদিন থেকে শাহারিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা ঝুমুরকে মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো। ঘটনারদিন (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে শাহারিয়া ভিডিও কল দিয়ে ঝুমুরকে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ করে। একপর্যায়ে তাকে (ঝুমুর) বিষপান করে মরে যাওয়ার কথা বলে। স্বামীর এ মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে পরিবারের সবার অজান্ত ঝুমুর বিষপান করে।

মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ও পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা এগারোটার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঝুমুর খানম সেতুকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরন করা হয়। পরবর্তীতে ওই গৃহবধূর স্বজনরা তাৎক্ষনিক ঝুমুরকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেল পাঁচটার দিকে ঝুমুর মৃত্যুরকোলে ঢলে পরেন।

নিহত ঝুমুরের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, বিষপানের পর তিনটি হাসপাতালে ভর্তি, পরবর্তীতে মৃত্যু থেকে দাফন পর্যন্ত তার (ঝুমুর) স্বামীর পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। অপরদিকে অভিযোগের বিষয়ে নিহত ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া কাজী শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কেউ কোন কথা বলতে রাজি হয়নি।

উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস পূর্বে ঝুমুর খানম সেতুর ২০ বছরের একমাত্র ভাই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ঝুমুর খানম সেতুর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারসহ ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।