বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বদলি যখন বাণিজ্য, লটারি তখন সংস্কারের নতুন পথ

সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে অনিয়ম, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এই অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি বদলি-বাণিজ্য বন্ধে একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত কর্মস্থলের জন্য যোগ্য সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ, তদবির কিংবা প্রভাবের পরিবর্তে একটি নির্ধারিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মস্থল নির্ধারণের এই উদ্যোগ তাই গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
কারণ, বদলি-পদায়নকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ শুধু সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলকে ঘিরে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বহুদিনের। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি যে ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়, সেই ব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সচিব পর্যায়ের পদায়ন-পদোন্নতি এবং জেলা প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছিল। এসব অভিযোগের সবগুলোর সত্যতা একভাবে প্রমাণিত—এমন দাবি করা যাবে না। তবে সরকারি পদায়নকে ঘিরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন যে এখনও বড় বাস্তবতা, তা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
একই চিত্র বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নেও দেখা যায়। স্বাস্থ্য, পুলিশ, প্রকৌশল, ভূমি প্রশাসনসহ নানা খাতে পছন্দের কর্মস্থল পাওয়ার জন্য তদবিরের সংস্কৃতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী বা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় দায়িত্ব পাওয়ার আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রে বদলি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে।
এখানেই লটারি পদ্ধতির গুরুত্ব।
যোগ্যতার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা গেলে ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ অনেকটাই কমতে পারে। একই সঙ্গে বদলি নিয়ে তদবিরের প্রয়োজনও কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, একজন কর্মকর্তা জানবেন—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে প্রভাব খাটিয়ে নয়, বরং নির্ধারিত নিয়মেই কর্মস্থল পাওয়া সম্ভব।
তবে লটারিকে দুর্নীতি নির্মূলের একমাত্র সমাধান ভাবলে ভুল হবে। লটারির আগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ—এসব বিষয়কে নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে প্রকাশ্য, ডিজিটাল, নিরীক্ষাযোগ্য এবং প্রয়োজনে জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য।
সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে উদ্যোগটি সফল হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে সব পদে একই পদ্ধতি হুবহু প্রয়োগ না করে সংশ্লিষ্ট পদের প্রকৃতি ও দায়িত্ব অনুযায়ী স্বচ্ছ বদলি নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
কারণ বদলি যদি বাণিজ্যে পরিণত হয়, তাহলে শুধু কর্মকর্তা নয়—শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। একজন কর্মকর্তা কোনো পদে যেতে যদি অনৈতিক অর্থ ব্যয়ের সুযোগ পান, তাহলে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর সেখান থেকেই ঘুষ, অনিয়ম ও সেবাগ্রহীতার ওপর বাড়তি চাপের জন্ম হতে পারে।
অন্যদিকে, যোগ্যতা ও নীতিমালার ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলে তাঁর কাছে জনগণের প্রতি জবাবদিহির প্রত্যাশাও বাড়ে। তখন পদ পাওয়ার পেছনে তদবির বা অর্থের পরিবর্তে কর্মদক্ষতা ও সততাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি শুধু একটি প্রশাসনিক পদ্ধতির পরিবর্তন নয়; এটি বদলি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি পরীক্ষামূলক সংস্কার। এই পরীক্ষায় সাফল্য এলে এর অভিজ্ঞতা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়ন ব্যবস্থার সংস্কারেও কাজে লাগতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

বদলি যখন বাণিজ্য, লটারি তখন সংস্কারের নতুন পথ

Update Time : ০২:৪২:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে অনিয়ম, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এই অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি বদলি-বাণিজ্য বন্ধে একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত কর্মস্থলের জন্য যোগ্য সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ, তদবির কিংবা প্রভাবের পরিবর্তে একটি নির্ধারিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মস্থল নির্ধারণের এই উদ্যোগ তাই গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
কারণ, বদলি-পদায়নকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ শুধু সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলকে ঘিরে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বহুদিনের। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি যে ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়, সেই ব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সচিব পর্যায়ের পদায়ন-পদোন্নতি এবং জেলা প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছিল। এসব অভিযোগের সবগুলোর সত্যতা একভাবে প্রমাণিত—এমন দাবি করা যাবে না। তবে সরকারি পদায়নকে ঘিরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন যে এখনও বড় বাস্তবতা, তা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
একই চিত্র বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নেও দেখা যায়। স্বাস্থ্য, পুলিশ, প্রকৌশল, ভূমি প্রশাসনসহ নানা খাতে পছন্দের কর্মস্থল পাওয়ার জন্য তদবিরের সংস্কৃতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী বা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় দায়িত্ব পাওয়ার আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রে বদলি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে।
এখানেই লটারি পদ্ধতির গুরুত্ব।
যোগ্যতার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা গেলে ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ অনেকটাই কমতে পারে। একই সঙ্গে বদলি নিয়ে তদবিরের প্রয়োজনও কমবে। সবচেয়ে বড় কথা, একজন কর্মকর্তা জানবেন—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে প্রভাব খাটিয়ে নয়, বরং নির্ধারিত নিয়মেই কর্মস্থল পাওয়া সম্ভব।
তবে লটারিকে দুর্নীতি নির্মূলের একমাত্র সমাধান ভাবলে ভুল হবে। লটারির আগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ—এসব বিষয়কে নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে প্রকাশ্য, ডিজিটাল, নিরীক্ষাযোগ্য এবং প্রয়োজনে জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য।
সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে উদ্যোগটি সফল হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে সব পদে একই পদ্ধতি হুবহু প্রয়োগ না করে সংশ্লিষ্ট পদের প্রকৃতি ও দায়িত্ব অনুযায়ী স্বচ্ছ বদলি নীতিমালা তৈরি করা দরকার।
কারণ বদলি যদি বাণিজ্যে পরিণত হয়, তাহলে শুধু কর্মকর্তা নয়—শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। একজন কর্মকর্তা কোনো পদে যেতে যদি অনৈতিক অর্থ ব্যয়ের সুযোগ পান, তাহলে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর সেখান থেকেই ঘুষ, অনিয়ম ও সেবাগ্রহীতার ওপর বাড়তি চাপের জন্ম হতে পারে।
অন্যদিকে, যোগ্যতা ও নীতিমালার ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলে তাঁর কাছে জনগণের প্রতি জবাবদিহির প্রত্যাশাও বাড়ে। তখন পদ পাওয়ার পেছনে তদবির বা অর্থের পরিবর্তে কর্মদক্ষতা ও সততাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি শুধু একটি প্রশাসনিক পদ্ধতির পরিবর্তন নয়; এটি বদলি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি পরীক্ষামূলক সংস্কার। এই পরীক্ষায় সাফল্য এলে এর অভিজ্ঞতা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়ন ব্যবস্থার সংস্কারেও কাজে লাগতে পারে।