বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুটপাত দখলমুক্তে ডিএনসিসির কঠোর অভিযান, দখলদারদের সতর্কবার্তা

রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধ বাণিজ্য ও অর্থ আদায়ের দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নগরবাসীর চলাচলের পথ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি দখলের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং উচ্ছেদ অভিযানে বাধা বা হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সিটি করপোরেশনের কর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন কঠোর বার্তা দেন।
তিনি বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। অভিযানে বাধা কিংবা হামলার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। মিরপুর-১০-এর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করার কথাও জানান তিনি।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, কয়েক দিন ধরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলছে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নগরবাসীর চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতাও প্রয়োজন।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ
হকারদের বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, হকারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসভা করে ফুটপাতে না বসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে ব্যবসার সুযোগ দিতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডও দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছুদিন পর অনেকেই ওই সিদ্ধান্ত না মেনে আবার ফুটপাতে বসেছেন বলে জানান তিনি।
প্রশাসকের ভাষ্য, ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ; সেখানে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না।
বিভিন্ন এলাকায় দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
ডিএনসিসির এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত নিয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানে দখল ও অর্থ আদায়ের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত ও ফুটপাতসংলগ্ন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও দোকানপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বা বাতি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং অপরাধী চক্রের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিরপুর-১০ নম্বর হোপের গলি ও আশপাশের ফুটপাতে কয়েক শ দোকান রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুর-১০-এর আইডিয়াল স্কুল ও সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাত এবং ফায়ার সার্ভিসসংলগ্ন এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিউমার্কেট-নীলক্ষেতেও অভিযোগ
নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট ও নূরজাহান মার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
নীলক্ষেত মোড় থেকে নিউমার্কেটের বিভিন্ন গেটসংলগ্ন ফুটপাতে শত শত দোকান রয়েছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার, গাউছিয়া থেকে ইস্টার্ন মল্লিকা, রাফিন প্লাজা থেকে চাঁদনি চক এবং নীলক্ষেতের বিভিন্ন অংশেও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠে এসেছে।
নিউমার্কেটের ভেতরের ফুটপাতেও অবৈধ দখল ও অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ ও মধ্য ঢাকাতেও একই চিত্র
রাজধানীর দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও ফুটপাত দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ধূপখোলা বাজার ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক দোকানকে ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথা পুলিশের একটি নথির বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্যামপুর মাইক্রো স্ট্যান্ডে যানবাহন এবং শ্যামপুর কাঁচাবাজারের দোকানগুলো থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন ফুটপাত নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কারওয়ান বাজার এলাকায় জনতা টাওয়ার, স্টেশন রোড, তেজকুনিপাড়া, ডিআইটি মার্কেট, মাছের আড়ত, ফলের বাজার ও বিভিন্ন দোকানসংলগ্ন ফুটপাতে দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। রামপুরা, মগবাজার ও আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন ফুটপাতেও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও লাইনম্যানদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
শুধু উচ্ছেদে সমাধান নয়
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, শুধু প্রান্তিক পর্যায়ের হকারদের উচ্ছেদ করলে ফুটপাত দখলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হকাররা অর্থ দিয়ে ফুটপাতে বসেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযানে তাদের সরিয়ে দিলেও এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকলে আবারও দখল তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় ও নির্দিষ্ট সময়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া এবং হলিডে মার্কেট ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল ঠেকাতে হবে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ
ফুটপাত দখল নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা।
মাইসফট হ্যাভেনের (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি এবং এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন করে অবৈধ স্থাপনা বা দখল শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব।
তিনি প্রতিটি ফুটপাতের ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে জিআইএসভিত্তিক ডেটাবেসে সংরক্ষণেরও পরামর্শ দেন। এতে কোন ফুটপাতের কতটুকু অংশ বৈধভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং কোথায় অবৈধ দখল হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অ্যাপ বা হটলাইন চালুর পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব?
রাজধানীর ফুটপাত দখলের বিষয়টি শুধু উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে হকারদের জীবিকা, অর্থ আদায়ের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক বিষয় জড়িত।
ডিএনসিসির কঠোর অভিযানের ফলে বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত খালি হলেও অতীতে একাধিকবার উচ্ছেদের পর পুনরায় দখলের অভিযোগ রয়েছে। ফলে এবার শুধু উচ্ছেদ নয়, দখল পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানো, অভিযোগের উৎস অনুসন্ধান এবং হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিএনসিসি প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পর এখন দেখার বিষয়—ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার এই উদ্যোগ কতটা নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার কতটা নিশ্চিত করা যায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

ফুটপাত দখলমুক্তে ডিএনসিসির কঠোর অভিযান, দখলদারদের সতর্কবার্তা

Update Time : ১০:০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধ বাণিজ্য ও অর্থ আদায়ের দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নগরবাসীর চলাচলের পথ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি দখলের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং উচ্ছেদ অভিযানে বাধা বা হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সিটি করপোরেশনের কর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন কঠোর বার্তা দেন।
তিনি বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। অভিযানে বাধা কিংবা হামলার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। মিরপুর-১০-এর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করার কথাও জানান তিনি।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, কয়েক দিন ধরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলছে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নগরবাসীর চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতাও প্রয়োজন।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ
হকারদের বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, হকারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসভা করে ফুটপাতে না বসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে ব্যবসার সুযোগ দিতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডও দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছুদিন পর অনেকেই ওই সিদ্ধান্ত না মেনে আবার ফুটপাতে বসেছেন বলে জানান তিনি।
প্রশাসকের ভাষ্য, ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ; সেখানে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না।
বিভিন্ন এলাকায় দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
ডিএনসিসির এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত নিয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানে দখল ও অর্থ আদায়ের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত ও ফুটপাতসংলগ্ন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও দোকানপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বা বাতি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং অপরাধী চক্রের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিরপুর-১০ নম্বর হোপের গলি ও আশপাশের ফুটপাতে কয়েক শ দোকান রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুর-১০-এর আইডিয়াল স্কুল ও সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাত এবং ফায়ার সার্ভিসসংলগ্ন এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিউমার্কেট-নীলক্ষেতেও অভিযোগ
নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট ও নূরজাহান মার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
নীলক্ষেত মোড় থেকে নিউমার্কেটের বিভিন্ন গেটসংলগ্ন ফুটপাতে শত শত দোকান রয়েছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার, গাউছিয়া থেকে ইস্টার্ন মল্লিকা, রাফিন প্লাজা থেকে চাঁদনি চক এবং নীলক্ষেতের বিভিন্ন অংশেও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠে এসেছে।
নিউমার্কেটের ভেতরের ফুটপাতেও অবৈধ দখল ও অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ ও মধ্য ঢাকাতেও একই চিত্র
রাজধানীর দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও ফুটপাত দখল ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ধূপখোলা বাজার ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক দোকানকে ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথা পুলিশের একটি নথির বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্যামপুর মাইক্রো স্ট্যান্ডে যানবাহন এবং শ্যামপুর কাঁচাবাজারের দোকানগুলো থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন ফুটপাত নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কারওয়ান বাজার এলাকায় জনতা টাওয়ার, স্টেশন রোড, তেজকুনিপাড়া, ডিআইটি মার্কেট, মাছের আড়ত, ফলের বাজার ও বিভিন্ন দোকানসংলগ্ন ফুটপাতে দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। রামপুরা, মগবাজার ও আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন ফুটপাতেও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও লাইনম্যানদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
শুধু উচ্ছেদে সমাধান নয়
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, শুধু প্রান্তিক পর্যায়ের হকারদের উচ্ছেদ করলে ফুটপাত দখলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হকাররা অর্থ দিয়ে ফুটপাতে বসেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযানে তাদের সরিয়ে দিলেও এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকলে আবারও দখল তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় ও নির্দিষ্ট সময়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া এবং হলিডে মার্কেট ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল ঠেকাতে হবে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ
ফুটপাত দখল নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা।
মাইসফট হ্যাভেনের (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি এবং এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন করে অবৈধ স্থাপনা বা দখল শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব।
তিনি প্রতিটি ফুটপাতের ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে জিআইএসভিত্তিক ডেটাবেসে সংরক্ষণেরও পরামর্শ দেন। এতে কোন ফুটপাতের কতটুকু অংশ বৈধভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং কোথায় অবৈধ দখল হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অ্যাপ বা হটলাইন চালুর পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব?
রাজধানীর ফুটপাত দখলের বিষয়টি শুধু উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে হকারদের জীবিকা, অর্থ আদায়ের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক বিষয় জড়িত।
ডিএনসিসির কঠোর অভিযানের ফলে বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত খালি হলেও অতীতে একাধিকবার উচ্ছেদের পর পুনরায় দখলের অভিযোগ রয়েছে। ফলে এবার শুধু উচ্ছেদ নয়, দখল পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানো, অভিযোগের উৎস অনুসন্ধান এবং হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিএনসিসি প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পর এখন দেখার বিষয়—ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার এই উদ্যোগ কতটা নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার কতটা নিশ্চিত করা যায়।