বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামপালের কয়লা দরপত্রে নথি যাচাই নিয়ে প্রশ্ন, উঠেছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম, নথি যাচাইয়ে ঘাটতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের খনি-সংযোগ, ‘মাইন এমওইউ’, সরবরাহ সক্ষমতা ও অন্যান্য নথির সত্যতা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সিঙ্গাপুরভিত্তিক লিয়ানেক্স এবং তাদের ব্যবসায়িক সহযোগী মোহিত মিনারেলস ও লোশে শিপিং নামের প্রতিষ্ঠানগুলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন কয়লা খনির নথি ও ‘মাইন এমওইউ’-এর সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে নথি যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণে দরপত্রে জমা দেওয়া নথিগুলো প্রকৃত কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে নির্ধারিত পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে সক্ষম কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে যোগ্য ঘোষণা করার আগে তার জমা দেওয়া নথি এবং সংশ্লিষ্ট খনির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু কোনো নথি উপস্থাপন করলেই কয়লার উৎসের সত্যতা নিশ্চিত হয় না। যথাযথ যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কয়লা সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে সেটি স্বাভাবিক। তবে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা, সরাসরি খনি-সংযোগ এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, চলমান দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়নি। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সক্ষমতা, প্রমাণিত সরবরাহ অভিজ্ঞতা কিংবা যাচাইকৃত কয়লা খনির নথি না থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি, খনি-সংযোগ, সরবরাহ সক্ষমতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। তাদের মতে, তদন্তে অনিয়ম, অসম আচরণ, তথ্য গোপন বা নথি যথাযথভাবে যাচাই না করার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে না। একটি দক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। তাই কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের যোগ্যতা, খনির নথি, কয়লার উৎস এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

রামপালের কয়লা দরপত্রে নথি যাচাই নিয়ে প্রশ্ন, উঠেছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

Update Time : ১২:৫৩:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম, নথি যাচাইয়ে ঘাটতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের খনি-সংযোগ, ‘মাইন এমওইউ’, সরবরাহ সক্ষমতা ও অন্যান্য নথির সত্যতা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সিঙ্গাপুরভিত্তিক লিয়ানেক্স এবং তাদের ব্যবসায়িক সহযোগী মোহিত মিনারেলস ও লোশে শিপিং নামের প্রতিষ্ঠানগুলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন কয়লা খনির নথি ও ‘মাইন এমওইউ’-এর সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে নথি যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণে দরপত্রে জমা দেওয়া নথিগুলো প্রকৃত কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে নির্ধারিত পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে সক্ষম কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে যোগ্য ঘোষণা করার আগে তার জমা দেওয়া নথি এবং সংশ্লিষ্ট খনির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু কোনো নথি উপস্থাপন করলেই কয়লার উৎসের সত্যতা নিশ্চিত হয় না। যথাযথ যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কয়লা সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে সেটি স্বাভাবিক। তবে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা, সরাসরি খনি-সংযোগ এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, চলমান দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়নি। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সক্ষমতা, প্রমাণিত সরবরাহ অভিজ্ঞতা কিংবা যাচাইকৃত কয়লা খনির নথি না থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি, খনি-সংযোগ, সরবরাহ সক্ষমতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। তাদের মতে, তদন্তে অনিয়ম, অসম আচরণ, তথ্য গোপন বা নথি যথাযথভাবে যাচাই না করার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে না। একটি দক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। তাই কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের যোগ্যতা, খনির নথি, কয়লার উৎস এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।