বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বসভায় তৃতীয় প্রজন্ম, নতুন বাস্তবতায় তারেক রহমান

জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের একজন সদস্য প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। এর আগে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন খালেদা জিয়া।
চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বদলেছে। ১৯৮০-এর দশকে বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল দারিদ্র্য, খাদ্য, জ্বালানি, ঋণ, বাণিজ্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারির প্রশ্ন। ২০২৬ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, টেকসই উন্নয়ন এবং নতুন ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, তারেক রহমানের এবারের ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু ইস্যু। বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো ঝুঁকি সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং প্রযুক্তি সহায়তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের কূটনীতিতে বড় একটি বিষয়। ২০১৭ সালের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রায় এক দশক ধরে সংকটটি অব্যাহত রয়েছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভাষণ এবং একজন বাংলাদেশির সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন—দুটি বিষয়ই দেশের কূটনৈতিক উপস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে ১৯৮০, ১৯৯০-এর দশক কিংবা ২০০০-এর দশকের আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। তাই আগের প্রজন্মের আন্তর্জাতিক বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের সরাসরি সমীকরণ করার চেয়ে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক অগ্রাধিকার কীভাবে বদলেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, খাদ্য ও উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আলোচনায় ছিল। আর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের বক্তব্যে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে তুলে ধরা হয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য কী ধরনের অগ্রাধিকার সামনে আসে—সেদিকেই থাকবে কূটনৈতিক মহলের নজর।
জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতার পাশাপাশি এই সফর বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার তুলে ধরারও একটি সুযোগ। অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সমন্বয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা কতটা স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়, সেটিই হবে এবারের সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

বিশ্বসভায় তৃতীয় প্রজন্ম, নতুন বাস্তবতায় তারেক রহমান

Update Time : ০৯:৪৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের একজন সদস্য প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। এর আগে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন খালেদা জিয়া।
চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বদলেছে। ১৯৮০-এর দশকে বৈশ্বিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল দারিদ্র্য, খাদ্য, জ্বালানি, ঋণ, বাণিজ্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারির প্রশ্ন। ২০২৬ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, টেকসই উন্নয়ন এবং নতুন ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, তারেক রহমানের এবারের ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু ইস্যু। বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো ঝুঁকি সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং প্রযুক্তি সহায়তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের কূটনীতিতে বড় একটি বিষয়। ২০১৭ সালের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রায় এক দশক ধরে সংকটটি অব্যাহত রয়েছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভাষণ এবং একজন বাংলাদেশির সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন—দুটি বিষয়ই দেশের কূটনৈতিক উপস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে ১৯৮০, ১৯৯০-এর দশক কিংবা ২০০০-এর দশকের আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। তাই আগের প্রজন্মের আন্তর্জাতিক বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের সরাসরি সমীকরণ করার চেয়ে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক অগ্রাধিকার কীভাবে বদলেছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, খাদ্য ও উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আলোচনায় ছিল। আর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের বক্তব্যে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে তুলে ধরা হয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য কী ধরনের অগ্রাধিকার সামনে আসে—সেদিকেই থাকবে কূটনৈতিক মহলের নজর।
জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতার পাশাপাশি এই সফর বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার তুলে ধরারও একটি সুযোগ। অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সমন্বয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা কতটা স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়, সেটিই হবে এবারের সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক।