যুদ্ধ হয়েছে, সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক বারবার তলানিতে ঠেকেছে—তবুও টিকে ছিল ভারত-পাকিস্তানের সিন্ধু পানি চুক্তি। কিন্তু ৬৬ বছর পর সেই চুক্তিই এখন গভীর সংকটে।
প্রশ্ন উঠছে—দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক যখন এতটাই অবনতিশীল, তখন পানি সহযোগিতাকে কি আর নিরাপত্তা ও রাজনীতির বাইরে রাখা সম্ভব?
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ভারত হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে এবং ঘোষণা দেয়—পাকিস্তান সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে।
নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতিকে তারা আর পানি, বাণিজ্য কিংবা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে আলাদা করে দেখতে চাইছে না।
তবে বিরোধটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই; গড়িয়েছে আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পর চুক্তির আওতায় গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি ট্রাইব্যুনাল জানায়, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা যায় না বলেও ট্রাইব্যুনাল মত দেয়।
পাকিস্তান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য—তারা ওই সালিসি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও ওই ট্রাইব্যুনালের নেই।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত হয় সিন্ধু পানি চুক্তি।
চুক্তি অনুযায়ী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানিতে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানিতে ভারত পায় অধিকতর অধিকার।
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা চললেও ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চুক্তিটি কার্যকর ছিল। আন্তর্জাতিক পরিসরে তাই এটিকে দীর্ঘস্থায়ী পানি সহযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বদলে গেছে।
দুই দেশের জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা বেড়েছে। বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। একই সঙ্গে কাশ্মীর, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কও হয়েছে আরও বৈরী।
ভারতের যুক্তি—পাহেলগাম হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতা। ফলে পানি সহযোগিতাকেও এই বৃহত্তর নিরাপত্তা বাস্তবতার বাইরে রাখার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে আন্তর্জাতিক আইনে সন্ত্রাসী হামলা ঘটলেই কোনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন সরল নিয়ম নেই।
বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত, পরিবর্তন কিংবা বাতিলের কিছু আইনি ভিত্তি রয়েছে। গুরুতর চুক্তিভঙ্গ অথবা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব রাজনীতিতেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে রাষ্ট্রগুলো পুরোনো চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার নজির রয়েছে।
তবে সিন্ধু পানি চুক্তির গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
পাকিস্তানের কৃষি, সেচব্যবস্থা ও খাদ্যনিরাপত্তার বড় অংশই সিন্ধু নদ অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইসলামাবাদের কাছে এই চুক্তি শুধু পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়—এটি দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
অন্যদিকে ভারতের কাছে বিষয়টি এখন নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।
ফলে প্রশ্নটা এখন শুধু—কে কত পানি পাবে, তা নয়।
প্রশ্ন হলো—দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা ভেঙে গেলে একটি আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি কতটা কার্যকর রাখা সম্ভব?
দ্য হেগের সালিসি ট্রাইব্যুনালের রায় আইনি বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু সেই রায় দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাস দূর করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কারণ সিন্ধু পানি বিরোধের পেছনে রয়েছে আরও বড় সংকট—সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাশ্মীর এবং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস।
ভারত বলছে, পানি সহযোগিতা স্বাভাবিক করতে হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নতি প্রয়োজন। আর পাকিস্তানের কাছে চুক্তির ধারাবাহিকতা সরাসরি পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন।
তাই ৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি এখন শুধু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির পরীক্ষা নয়।
এটি পরীক্ষা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যতেরও।
যে চুক্তি যুদ্ধের মধ্যেও টিকে ছিল, সেটি কি এবার রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কাছে হার মানবে—নাকি দুই দেশ আবারও পানি সহযোগিতার পথ খুঁজে নেবে?
উত্তরটা নির্ভর করছে শুধু আদালতের রায়ের ওপর নয়, নির্ভর করছে দিল্লি ও ইসলামাবাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের সক্ষমতার ওপর।
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
যে পানি চুক্তি যুদ্ধের মধ্যেও টিকে ছিল, সেটিই এখন সংকটে
-
বিশেষ প্রতিনিধি: - Update Time : ০৮:৫৬:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ৪৮ Time View
Tag :
Popular Post























