হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোনে চলাচলকারী যানবাহনের গতিবিধি নজরদারিতে ঘাটতি রয়েছে। এসব যানবাহনে বাধ্যতামূলক ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপন না করায় বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একাধিক নির্দেশনা ও সময়সীমা নির্ধারণের পরও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। এ অবস্থায় আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহনকে এয়ারসাইডে চলাচলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কোনো যানবাহন অনুমোদনহীনভাবে প্রবেশ করলে কিংবা নির্ধারিত পথের বাইরে চলাচল করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে উড়োজাহাজের নিরাপদ ওঠানামা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন যান কোথায় রয়েছে, কী গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত এলাকায় আছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা প্রয়োজন। রানওয়ে বা ট্যাক্সিওয়েতে কোনো যানবাহনের সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ভিটিএস স্থাপনের জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার সময় দেওয়া হয়েছে এবং তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এবার আর সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন না করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনকে এয়ারসাইডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, ভিটিএস চালু হলে এয়ারসাইডে চলাচলকারী অনুমোদিত যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় এসব যানবাহনের চলাচল কার্যকরভাবে নজরদারি করা যাচ্ছে না। কোন এয়ারলাইন্স কতটি গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেছে এবং কতটি গাড়ি এখনো বাকি রয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা, স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্সসহ বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ভিটিএস স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকায় উড়োজাহাজ ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ভিটিএস স্থাপন বাধ্যতামূলক করে বেবিচক। সদ্য স্থাপিত সিএনএস-এটিএম ও অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের (এ-এসএমজিসিএস) আওতায় এ ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বেবিচকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন করে তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। পরে কাজ শেষ না হওয়ায় সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। এরপরও নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় গত ২৬ অক্টোবর বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে ‘অতীব জরুরি’ চিঠি জারি করা হয়। পরিচালক মো. শামসুল হকের সই করা ওই চিঠিতে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন সম্পন্ন করে শতভাগ বাস্তবায়নের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই সময়সীমাও পার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরপরও কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানি ভিটিএসযুক্ত যানবাহনের তালিকা জমা দেয়নি।
এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনসংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহন এয়ারসাইডে চলাচল করতে পারবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে এবং এর ফলে কোনো দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে দায়ভার বহন করতে হবে বলেও বেবিচকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে বিদ্যমান রাডারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি গাড়ির অবস্থান ও গতিবিধি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। কোনো গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করলে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উড়োজাহাজের ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
ভিটিএস স্থাপনে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে এয়ার অ্যাস্ট্রার হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড এয়ারলাইন সিকিউরিটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম সারওয়ার জামান বলেন, ভিটিএস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই ভিটিএস স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভিটিএস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় তালিকা বেবিচকের কাছে জমা দেওয়া হবে।
বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচলের কারণে উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে শাহজালাল বিমানবন্দরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালে বিমানের হ্যাঙ্গার থেকে একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ বের করার সময় সেটি সেখানে থাকা আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এয়ারসাইডে যানবাহনের অবস্থান ও চলাচল পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে এ-এসএমজিসিএস ও ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় চলাচলকারী উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য যান্ত্রিক যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে। তবে উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সাপোর্ট যান, ক্যাটারিং ভ্যান, কার্গো ভ্যান, বাসসহ অন্যান্য সেবামূলক যানবাহনে প্রয়োজনীয় ট্র্যাকার স্থাপন না করায় প্রযুক্তিটির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
বিমানবন্দরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে শতাধিক ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। তবে যানবাহনে ট্র্যাকার স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনা না গেলে বিদ্যমান প্রযুক্তির কার্যকারিতা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাবে না। তাই বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করতে এখন বেবিচকের নির্দেশনা বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
রানওয়েতে নজরদারির ঘাটতি, শাহজালালে দুর্ঘটনার শঙ্কা
-
স্টাফ রিপোর্টার: - Update Time : ০৮:১৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- ১৩ Time View
Tag :
Popular Post






















