বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একই খেলাপি ঋণে নীতি সহায়তায় দুই রকম নিয়ম

খেলাপি ঋণ আদায় ও মামলাজট নিরসনে ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতি সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহারের শর্তে দেখা দিয়েছে ভিন্নতা। ব্যাংকের ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহার ও হলফনামা জমা দেওয়ার পর আবেদন বিবেচনার বিধান থাকলেও ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে আগে ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নীতিগত সম্মতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা সার্কুলার লেটার নম্বর ২৫ অনুযায়ী, সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো রিট বা অন্য মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি জমা দিতে হবে হলফনামা ও মামলা প্রত্যাহারের তালিকা। তবে মামলা প্রত্যাহারের আগে নীতি সহায়তা পাওয়ার লিখিত নিশ্চয়তার বিধান নেই।
অন্যদিকে, ১৭ আগস্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা সার্কুলার লেটার নম্বর ১৬-তে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ঋণগ্রহীতার আবেদন ও ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। প্রস্তাব সন্তোষজনক হলে দেওয়া হবে নীতিগত সম্মতিপত্র। এরপর মামলা প্রত্যাহার করে প্রয়োজনীয় হলফনামা জমা দিতে হবে। হলফনামা পাওয়ার পর অনুমোদিত নীতি সহায়তা বা প্রণোদনার শর্ত পরিবর্তন না করার নির্দেশনাও রয়েছে।
অর্থাৎ, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের আগে মামলা প্রত্যাহার করতে হচ্ছে, আর ফাইন্যান্স কোম্পানির গ্রাহকেরা মামলা প্রত্যাহারের আগেই নীতিগত সম্মতি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ আদায় ও মামলাজট কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও মামলা প্রত্যাহারের আগে সহায়তার নিশ্চয়তা না থাকলে ঋণগ্রহীতারা অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। এতে ব্যবসা পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক। বছরের পর বছর ঋণের টাকা ফেরত না পেয়ে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে মামলা করে। ব্যবসা করতে হলে ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ঋণ আদায়ই সার্কুলার দুটির প্রধান উদ্দেশ্য। তবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি আলাদা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সার্কুলারও আলাদা হতে পারে। তবে একই ধরনের ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে দুই রকম নির্দেশনার কারণ তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন বলেও জানান তিনি।
টাস্কফোর্স অন ইকোনমিক রিফর্মসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ৫০০টির বেশি মামলায় আটকে ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আদালতের স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার স্বার্থে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির জন্য নীতি সহায়তার শর্তে সমন্বয় আনা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহারের আগে লিখিত নীতিগত সম্মতির সুযোগ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও রাখা হবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

সিলেটে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার গ্রেপ্তার

একই খেলাপি ঋণে নীতি সহায়তায় দুই রকম নিয়ম

Update Time : ০৮:৩৯:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

খেলাপি ঋণ আদায় ও মামলাজট নিরসনে ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতি সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহারের শর্তে দেখা দিয়েছে ভিন্নতা। ব্যাংকের ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহার ও হলফনামা জমা দেওয়ার পর আবেদন বিবেচনার বিধান থাকলেও ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে আগে ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নীতিগত সম্মতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা সার্কুলার লেটার নম্বর ২৫ অনুযায়ী, সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো রিট বা অন্য মামলা অনিষ্পন্ন থাকলে তা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি জমা দিতে হবে হলফনামা ও মামলা প্রত্যাহারের তালিকা। তবে মামলা প্রত্যাহারের আগে নীতি সহায়তা পাওয়ার লিখিত নিশ্চয়তার বিধান নেই।
অন্যদিকে, ১৭ আগস্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা সার্কুলার লেটার নম্বর ১৬-তে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ঋণগ্রহীতার আবেদন ও ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। প্রস্তাব সন্তোষজনক হলে দেওয়া হবে নীতিগত সম্মতিপত্র। এরপর মামলা প্রত্যাহার করে প্রয়োজনীয় হলফনামা জমা দিতে হবে। হলফনামা পাওয়ার পর অনুমোদিত নীতি সহায়তা বা প্রণোদনার শর্ত পরিবর্তন না করার নির্দেশনাও রয়েছে।
অর্থাৎ, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের আগে মামলা প্রত্যাহার করতে হচ্ছে, আর ফাইন্যান্স কোম্পানির গ্রাহকেরা মামলা প্রত্যাহারের আগেই নীতিগত সম্মতি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ আদায় ও মামলাজট কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও মামলা প্রত্যাহারের আগে সহায়তার নিশ্চয়তা না থাকলে ঋণগ্রহীতারা অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। এতে ব্যবসা পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক। বছরের পর বছর ঋণের টাকা ফেরত না পেয়ে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে মামলা করে। ব্যবসা করতে হলে ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ঋণ আদায়ই সার্কুলার দুটির প্রধান উদ্দেশ্য। তবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি আলাদা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সার্কুলারও আলাদা হতে পারে। তবে একই ধরনের ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে দুই রকম নির্দেশনার কারণ তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন বলেও জানান তিনি।
টাস্কফোর্স অন ইকোনমিক রিফর্মসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ৫০০টির বেশি মামলায় আটকে ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আদালতের স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার স্বার্থে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির জন্য নীতি সহায়তার শর্তে সমন্বয় আনা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহারের আগে লিখিত নীতিগত সম্মতির সুযোগ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও রাখা হবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।