দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহ, বিপুল বকেয়া, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত দেড় দশকের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া নীতিগত পরিবর্তন। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত বিশেষ বিধানের পরিবর্তন, নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এবং কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প বাতিল উল্লেখযোগ্য।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে পাইপলাইনে থাকা বেশ কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল কয়েক হাজার মেগাওয়াট বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা ও রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সরকারের যুক্তি ছিল, পুরোনো পদ্ধতির পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা, অনিয়মের সুযোগ কমানো এবং প্রকল্প গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়ানো।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতের বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বকেয়া বিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধে বিলম্বের কারণে খাতটিতে আর্থিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে কেন্দ্র পরিচালনা ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
একইভাবে গ্যাস, কয়লা ও তেল আমদানির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান এবং উৎপাদনকারীদের সময়মতো অর্থ পরিশোধ। এসব জায়গায় সংকট তৈরি হলে উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়তে পারে।
জ্বালানি খাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এলএনজি-সংক্রান্ত একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিটি নিয়ে জ্বালানি খাতে নানা প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার সম্পৃক্ততা এবং প্রচলিত ক্রয়প্রক্রিয়া কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতাকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও পরিবেশগত প্রভাব ও সরকারের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদীদের আপত্তি থাকলেও প্রকল্পটি বন্ধ বা বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু একটি সরকারের সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখছেন না জ্বালানি খাতের অনেক পর্যবেক্ষক। তাদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত সক্ষমতা, গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সংকটকে তীব্র করতে পারে।
এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া প্রকল্প বাতিল, নতুন দরপত্র ও বকেয়া ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
বর্তমান সরকারও বাতিল হওয়া কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সময়মতো বকেয়া পরিশোধ এবং দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহার। এসব নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে।
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্যে বকেয়া, জ্বালানি ঘাটতি ও নীতির টানাপোড়েন
-
স্টাফ রিপোর্টার: - Update Time : ০৫:৫৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ৪৫ Time View
Tag :
Popular Post






















