মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টঙ্গী থেকে কাশিমপুরে মাদকের কারবার, জড়িত একাধিক নারী

রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় গাজীপুরের টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এই কারবারে পুরুষের পাশাপাশি একাধিক নারীও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব এলাকায় ছোট-বড় মাদক কারবারিদের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশ সক্রিয়। তাঁদের ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। পরিবারের সদস্যসহ আরও কয়েকজন নারী ও পুরুষ তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে শুরু করে পরে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার কারবারে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছরের ২ নভেম্বর তাঁকে ইয়াবা ও হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই বস্তির ময়না খাতুনের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক কারবারের অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এ কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁর মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলাম ও ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলা থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আগে তিনি ফেনসিডিলের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এ কাজে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে কেরানীরটেক বস্তিতে কুলসুমের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর সম্পদ বেড়েছে। রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ বলে জানা গেছে। একই এলাকার কারিমা বেগমের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গত ১৮ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও লক্ষ্মীপুরা এলাকাতেও নারী মাদক কারবারিদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার ডালিয়া বেগমকে ঘিরেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে এবং তাঁর পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে। লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁদের সম্পদ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাদক কারবারে জড়িতরা একা কাজ করে না। স্থানীয় পর্যায়ে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির কাজ পরিচালিত হয়। এই নেটওয়ার্কে নারী-পুরুষ উভয়েরই সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। গত আট মাসে এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তিতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহের উৎস বন্ধ করার পাশাপাশি কারবারের অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ

টঙ্গী থেকে কাশিমপুরে মাদকের কারবার, জড়িত একাধিক নারী

Update Time : ০৫:৩৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় গাজীপুরের টঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ বিভিন্ন বস্তিতে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এই কারবারে পুরুষের পাশাপাশি একাধিক নারীও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব এলাকায় ছোট-বড় মাদক কারবারিদের পাশাপাশি নারীদের একটি অংশ সক্রিয়। তাঁদের ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক। পরিবারের সদস্যসহ আরও কয়েকজন নারী ও পুরুষ তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তির বাসিন্দা মোমেলা বেগমকে বড় মাদক কারবারিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গাঁজা দিয়ে শুরু করে পরে ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবার কারবারে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছরের ২ নভেম্বর তাঁকে ইয়াবা ও হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই বস্তির ময়না খাতুনের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক কারবারের অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এ কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁর মেয়ে নার্গিস ও পুত্রবধূ রোজীর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। ময়না খাতুনের ভাই শফিকুল ইসলাম ও ছেলে তাজুল ইসলাম তাজুর বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত মামলা থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘বড় আপা’ নামে পরিচিত আফরিনা আক্তারের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আগে তিনি ফেনসিডিলের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এ কাজে তাঁর স্বামী ও ভাই সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে কেরানীরটেক বস্তিতে কুলসুমের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর সম্পদ বেড়েছে। রেলওয়ের জায়গা দখল করে মাদক বিক্রির স্থান তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাঁর বোন নার্গিসকে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ বলে জানা গেছে। একই এলাকার কারিমা বেগমের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গত ১৮ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। টঙ্গীর বাইরে গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও লক্ষ্মীপুরা এলাকাতেও নারী মাদক কারবারিদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার ডালিয়া বেগমকে ঘিরেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে এবং তাঁর পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে। লক্ষ্মীপুরা এলাকার তাহমিনা ও আশার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁদের সম্পদ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাদক কারবারে জড়িতরা একা কাজ করে না। স্থানীয় পর্যায়ে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক সংগ্রহ, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির কাজ পরিচালিত হয়। এই নেটওয়ার্কে নারী-পুরুষ উভয়েরই সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। গত আট মাসে এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অনেক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। টঙ্গীকে মাদকমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তিতে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহের উৎস বন্ধ করার পাশাপাশি কারবারের অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।