মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ে নতুন আশার গল্প, ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন

সবুজ পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বান্দরবানের প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করা মানুষের জীবন সহজ নয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সীমিত কর্মসংস্থান ও কৃষিনির্ভর জীবিকার কারণে অনেক পরিবারকে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস জুম চাষ। প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই আয়ে সারা বছর সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। এই বাস্তবতায় পরিবারের নারী ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজের আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ তাঁদের অনেকেরই রয়েছে কাজ শেখার আগ্রহ ও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। এমন স্বপ্নবাজ নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সংগঠনটির উদ্যোগে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসব্যাপী বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। ফলে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের সামনে এখন নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আলীকদম ও বান্দরবান সদর উপজেলা হলরুমে আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহেদ পারভেজ, বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু, বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে চান চামমুম
আলীকদম উপজেলার মারানপাড়ার চামমুম ম্রো তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারের সন্তান। বর্তমানে আলীকদম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। বাবা রেংকাই ম্রো জুম চাষ করেন। তাঁর আয় দিয়েই পরিবারের এত সদস্যের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হয়। ছোটবেলা থেকেই অভাবের বাস্তবতা দেখেছে চামমুম। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় নিজের প্রয়োজনের খরচের জন্যও পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হতো।
সেলাই প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছে সে।
চামমুম জানায়, বাবার জুম চাষের আয় দিয়ে পরিবারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন। এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে চায় সে। তার কাছে সেলাই মেশিনটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগ। বাবার অসুস্থতার মধ্যেও থামেনি লাইজুর পড়াশোনা
আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের লাইজু আক্তারের জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। লামা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছয় বোনের একজন। প্রায় ১৩ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন লাইজুর বাবা। এরপর থেকেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। বাবার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় বোনদের সহযোগিতায় চলছে সংসার ও লাইজুর পড়াশোনা।
নিজের সব প্রয়োজনের জন্য পরিবারের ওপর নির্ভর করতে চায় না লাইজু। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের কিছু খরচ চালায়।
এর মধ্যেই সেলাই শেখার সুযোগ পায় সে। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে পেয়েছে একটি সেলাই মেশিনও। এখন টিউশনের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার পরিকল্পনা করছে লাইজু।
তার বিশ্বাস, নিজের আয় দিয়ে পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে চায় সে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান মাসিংচিং
বান্দরবান সদর উপজেলার রেনীং পাড়ার মাসিংচিং মার্মা সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর একজন। লোটাস শিশু সদন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বাবা থোয়াইচিংনু মার্মা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে কর্মরত।
দুই বোনের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দক্ষতা অর্জনের ইচ্ছা ছিল মাসিংচিংয়ের। সেলাই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন নিজের একটি মেশিনও রয়েছে তার হাতে। ভবিষ্যতে এই মেশিন ব্যবহার করে আয় করতে চায় সে। নিজের পড়াশোনার খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে মাসিংচিং।
মায়ের অনুপস্থিতিতে মেসাইনুর লড়াই বান্দরবান সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেসাইনু মার্মার জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। তাঁর মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা সাবাই উ মার্মা কৃষিকাজ করে সংসার চালান।
বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে মেসাইনুর পড়াশোনা। পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা তাঁকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কাজ শেখার সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন তিনি। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পাওয়ায় এখন সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে আয় করে বাবার আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে চান মেসাইনু। শ্যামলীর পরিবারেও স্বচ্ছলতার অপেক্ষা এই উদ্যোগের আরেক উপকারভোগী শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যা বান্দরবান সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা কদম তঞ্চঙ্গ্যা খুব বেশি আয় করতে পারেন না। পরিবারের ব্যয় মেটাতে এনজিওতে কর্মরত ভাইয়ের আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
এই বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্যামলী। ভবিষ্যতে নিজের আয়ে পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর। সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারলে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখা সম্ভব হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর। প্রশিক্ষণের সঙ্গে মেশিন, তৈরি হলো কাজের সুযোগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ করলেই অনেক সময় সেটি দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। এ কারণে মেশিন দেওয়ার আগে নারীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা সেলাইয়ের মৌলিক কাজ শেখার পাশাপাশি মেশিন ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
আয়োজকদের মতে, সীমিত আয়ের পরিবার, কর্মসংস্থানের অভাব ও সংসারের নানা দায়িত্বের কারণে অনেক নারী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। তাঁদের একটি ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর উপকরণ দেওয়া হলে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করা সহজ হয়। আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন।
বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দেওয়া তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে সহায়তা করবে।
বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু বলেন, শুধু মেশিন বিতরণ নয়, তার আগে তিন মাসের বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণ দেওয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকারভোগীরা মেশিন ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছেন। ফলে সেলাই মেশিন তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগ পান না। তাঁদের দক্ষ করে তুলতে পারলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি মেশিন, একটি পরিবারের নতুন সম্ভাবনা সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাঁদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। কারও বাবা জুম চাষ করেন, কারও বাবা কৃষিকাজ করেন, আবার কারও পরিবারে অসুস্থতা বা সীমিত আয়ের কারণে সংসার চালানোই কঠিন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও স্বপ্ন প্রায় একই—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, নিজের প্রয়োজনের কিছুটা নিজে মেটানো এবং সুযোগ পেলে পরিবারকে সহযোগিতা করা। সেলাই মেশিন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাঁদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো সীমিত। এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হলে কয়েকটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি নারীদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মানসিকতাও আরও শক্তিশালী হবে। চামমুম, লাইজু, মাসিংচিং, মেসাইনু কিংবা শ্যামলী—প্রত্যেকের হাতে এখন একটি করে সেলাই মেশিন। কারও কাছে এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অবলম্বন, কারও কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, আবার কারও কাছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম পুঁজি। পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে তাই ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন পৌঁছে দেওয়া যেন নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন, তা সময়ই বলবে। তবে শুরুটা হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Kaysar Plabon

Popular Post

বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ

পাহাড়ে নতুন আশার গল্প, ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন

Update Time : ০৭:৩৭:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবুজ পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বান্দরবানের প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করা মানুষের জীবন সহজ নয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সীমিত কর্মসংস্থান ও কৃষিনির্ভর জীবিকার কারণে অনেক পরিবারকে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস জুম চাষ। প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই আয়ে সারা বছর সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। এই বাস্তবতায় পরিবারের নারী ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজের আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ তাঁদের অনেকেরই রয়েছে কাজ শেখার আগ্রহ ও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। এমন স্বপ্নবাজ নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সংগঠনটির উদ্যোগে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসব্যাপী বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। ফলে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের সামনে এখন নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আলীকদম ও বান্দরবান সদর উপজেলা হলরুমে আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহেদ পারভেজ, বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু, বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে চান চামমুম
আলীকদম উপজেলার মারানপাড়ার চামমুম ম্রো তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারের সন্তান। বর্তমানে আলীকদম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। বাবা রেংকাই ম্রো জুম চাষ করেন। তাঁর আয় দিয়েই পরিবারের এত সদস্যের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হয়। ছোটবেলা থেকেই অভাবের বাস্তবতা দেখেছে চামমুম। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় নিজের প্রয়োজনের খরচের জন্যও পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হতো।
সেলাই প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছে সে।
চামমুম জানায়, বাবার জুম চাষের আয় দিয়ে পরিবারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন। এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে চায় সে। তার কাছে সেলাই মেশিনটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগ। বাবার অসুস্থতার মধ্যেও থামেনি লাইজুর পড়াশোনা
আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের লাইজু আক্তারের জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। লামা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছয় বোনের একজন। প্রায় ১৩ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন লাইজুর বাবা। এরপর থেকেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। বাবার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় বোনদের সহযোগিতায় চলছে সংসার ও লাইজুর পড়াশোনা।
নিজের সব প্রয়োজনের জন্য পরিবারের ওপর নির্ভর করতে চায় না লাইজু। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের কিছু খরচ চালায়।
এর মধ্যেই সেলাই শেখার সুযোগ পায় সে। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে পেয়েছে একটি সেলাই মেশিনও। এখন টিউশনের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার পরিকল্পনা করছে লাইজু।
তার বিশ্বাস, নিজের আয় দিয়ে পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে চায় সে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান মাসিংচিং
বান্দরবান সদর উপজেলার রেনীং পাড়ার মাসিংচিং মার্মা সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর একজন। লোটাস শিশু সদন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বাবা থোয়াইচিংনু মার্মা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে কর্মরত।
দুই বোনের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দক্ষতা অর্জনের ইচ্ছা ছিল মাসিংচিংয়ের। সেলাই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন নিজের একটি মেশিনও রয়েছে তার হাতে। ভবিষ্যতে এই মেশিন ব্যবহার করে আয় করতে চায় সে। নিজের পড়াশোনার খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে মাসিংচিং।
মায়ের অনুপস্থিতিতে মেসাইনুর লড়াই বান্দরবান সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেসাইনু মার্মার জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। তাঁর মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা সাবাই উ মার্মা কৃষিকাজ করে সংসার চালান।
বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে মেসাইনুর পড়াশোনা। পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা তাঁকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কাজ শেখার সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন তিনি। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পাওয়ায় এখন সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে আয় করে বাবার আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে চান মেসাইনু। শ্যামলীর পরিবারেও স্বচ্ছলতার অপেক্ষা এই উদ্যোগের আরেক উপকারভোগী শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যা বান্দরবান সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা কদম তঞ্চঙ্গ্যা খুব বেশি আয় করতে পারেন না। পরিবারের ব্যয় মেটাতে এনজিওতে কর্মরত ভাইয়ের আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
এই বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্যামলী। ভবিষ্যতে নিজের আয়ে পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর। সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারলে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখা সম্ভব হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর। প্রশিক্ষণের সঙ্গে মেশিন, তৈরি হলো কাজের সুযোগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ করলেই অনেক সময় সেটি দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। এ কারণে মেশিন দেওয়ার আগে নারীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা সেলাইয়ের মৌলিক কাজ শেখার পাশাপাশি মেশিন ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
আয়োজকদের মতে, সীমিত আয়ের পরিবার, কর্মসংস্থানের অভাব ও সংসারের নানা দায়িত্বের কারণে অনেক নারী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। তাঁদের একটি ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর উপকরণ দেওয়া হলে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করা সহজ হয়। আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন।
বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দেওয়া তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে সহায়তা করবে।
বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু বলেন, শুধু মেশিন বিতরণ নয়, তার আগে তিন মাসের বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণ দেওয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকারভোগীরা মেশিন ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছেন। ফলে সেলাই মেশিন তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগ পান না। তাঁদের দক্ষ করে তুলতে পারলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি মেশিন, একটি পরিবারের নতুন সম্ভাবনা সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাঁদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। কারও বাবা জুম চাষ করেন, কারও বাবা কৃষিকাজ করেন, আবার কারও পরিবারে অসুস্থতা বা সীমিত আয়ের কারণে সংসার চালানোই কঠিন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও স্বপ্ন প্রায় একই—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, নিজের প্রয়োজনের কিছুটা নিজে মেটানো এবং সুযোগ পেলে পরিবারকে সহযোগিতা করা। সেলাই মেশিন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাঁদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো সীমিত। এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হলে কয়েকটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি নারীদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মানসিকতাও আরও শক্তিশালী হবে। চামমুম, লাইজু, মাসিংচিং, মেসাইনু কিংবা শ্যামলী—প্রত্যেকের হাতে এখন একটি করে সেলাই মেশিন। কারও কাছে এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অবলম্বন, কারও কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, আবার কারও কাছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম পুঁজি। পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে তাই ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন পৌঁছে দেওয়া যেন নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন, তা সময়ই বলবে। তবে শুরুটা হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে।